অজয় বাঙালী
বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা সেতুর কারণে প্রথমে ২০ টাকা চালের দাম বৃদ্ধি পরে ‘অযাচিত প্রকল্প’ আখ্যা দিয়েছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন। যিনি একই সময়ে দেশের এভিয়েশন খাতে নিজস্ব ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রক্রিয়ায় রয়েছেন।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে, এই বক্তব্যকে বিচ্ছিন্ন কোনো মতামত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর যশোর-বরিশালে ফ্লাইট হ্রাস
পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকা-যশোর ও ঢাকা-বরিশাল রুটে ফ্লাইটের চাহিদা কমে যাওয়ায় সমস্যায় পড়েছে নভোএয়ার ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস। যাত্রীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় এই দুই এয়ারলাইনস বরিশালে ফ্লাইট বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে এবং যশোরে ফ্লাইটের সংখ্যা প্রতিদিন এক বা দুয়ে কমিয়ে এনেছে।
নভোএয়ারের দুটি এটিআর-৭২ টার্বোপ্রপ উড়োজাহাজ নেপালের শীর্ষ অভ্যন্তরীণ উড়োজাহাজ পরিবহন প্রতিষ্ঠান ইয়েতি এয়ারলাইনসের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে।
নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ এই দুই রুটে যাত্রী সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যাওয়ায় আমাদের ৭টি উড়োজাহাজের মধ্যে দুটি বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘পদ্মা সেতুর কারণে যশোর ও বরিশালে যাত্রীর সংখ্যা কমে যাওয়ার মূল কারণ। মানুষ এখন ৪-৫ ঘণ্টার মধ্যে এই জেলাগুলোয় যেতে পারছেন।’
এই বাস্তবতা যখন বিমান খাতের জন্য এক ধরনের কাঠামোগত সংকট তৈরি করেছে, ঠিক তখনই বাণিজ্য ও বেসামরিক বিমান পরিবহণ উপদেষ্টা পদ্মা সেতুকে ‘অযাচিত প্রকল্প’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন এবং এটিকে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও টাকার অবমূল্যায়নের সঙ্গে যুক্ত করছেন।
বিমান ব্যবসায় নেমে খেই হারিয়েই কী এমন মন্তব্য
এই পর্যায়ে অনুসন্ধান ঘুরে যায় উপদেষ্টার ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক উদ্যোগের দিকে। শেখ বশিরউদ্দিনের মালিকানাধীন আকিজ বশির গ্রুপ ‘আকিজ বশির এভিয়েশন লিমিটেড’ নামে একটি হেলিকপ্টারভিত্তিক এয়ারলাইন্স চালুর উদ্যোগ নেয়।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কাছে অভিপ্রায়পত্র জমা দেওয়া হয়, পরবর্তীতে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হয় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন থেকে। লাইসেন্সে ব্যবসার ধরন হিসেবে এভিয়েশন সার্ভিস উল্লেখ রয়েছে এবং এতে উপদেষ্টার ব্যক্তিগত ছবি সংযুক্ত।
এখানেই অনুসন্ধান একটি গুরুতর প্রশ্নের মুখোমুখি হয়।
এভিয়েশন ব্যবসার লাইসেন্স, অপারেশনাল অনুমোদন, নিরাপত্তা ছাড়পত্র এবং রুট অনুমতি—সবকিছুই যে মন্ত্রণালয়ের অধীন, সেই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টা নিজেই ওই লাইসেন্সপ্রত্যাশী প্রতিষ্ঠানের মালিক।
আরও উদ্বেগজনক হলো, ট্রেড লাইসেন্স পাওয়ার পর বেবিচকের ফ্লাইট সেফটি রেগুলেশন কমিটির বৈঠকে আকিজ বশির এভিয়েশনের মালিক হিসেবে শেখ বশিরউদ্দিন নিজেই ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নেন।
অর্থাৎ, একদিকে তিনি নীতিনির্ধারক, অন্যদিকে লাইসেন্সপ্রার্থী—এই দ্বৈত অবস্থান কোনোভাবেই নিরপেক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থান কেবল নৈতিক বিচ্যুতি নয়, সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪৭ অনুচ্ছেদে মন্ত্রী ও মন্ত্রী সমমর্যাদার ব্যক্তিদের কোনো লাভজনক পদে থাকা বা মুনাফাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় যুক্ত থাকার ওপর স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
উপদেষ্টা পদটি যেহেতু মন্ত্রী সমমর্যাদার, সেক্ষেত্রে নিজের নামে ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া এবং সেই ব্যবসার জন্য সরকারি অনুমোদন চাওয়া সাংবিধানিক বাধার মুখে পড়ে।
আইনজীবীরা বলছেন, লাইসেন্স না পেলেও লাইসেন্স নেওয়ার প্রস্তুতি ও আবেদন প্রক্রিয়াতেই যুক্ত হওয়াও স্বার্থসংঘাত হিসেবে বিবেচিত।
এই প্রেক্ষাপটে পদ্মা সেতুকে ‘অযাচিত প্রকল্প’ বলা একটি রাজনৈতিক অবস্থানমাত্র নয়, বরং একটি স্বার্থসংশ্লিষ্ট বক্তব্য হিসেবে নতুন মাত্রা পায়। কারণ, এই সেতু সরাসরি সেই খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, যেখানে উপদেষ্টা নিজে ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো প্রকল্পকে দায়ী করে বাজার সংকটের ব্যাখ্যা দেওয়ার মধ্য দিয়ে একটি প্রশ্ন অনিবার্যভাবে সামনে আসে—এই বক্তব্য কি জনস্বার্থের প্রতিফলন, নাকি ব্যক্তিগত ও করপোরেট স্বার্থের ক্ষোভের ভাষ্য?
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যতিক্রম হিসেবে দেখছে না।
সংস্থাটির মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের হাতে ন্যস্ত ক্ষমতা ব্যক্তিগত বা করপোরেট স্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগ বারবার উঠে আসছে, যা সরকারের নৈতিক অবস্থানকে ক্রমেই দুর্বল করছে। এর ফলে সুশাসনের প্রতিশ্রুতি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে এবং জনআস্থার ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ছে।
