নিজস্ব প্রতিবেদক
হাইকোর্ট মাজারের পীর অলি-এ-বাংলা খ্যাত সুফি সাধক খাজা শরফুদ্দিন চিশতি–এর ওরশকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রায় ৭শ বছরের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে তাঁর তিন দিনব্যাপী ওরশ পালনের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
খাজা শরফুদ্দিন চিশতি ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। অর্থাৎ ঢাকা শহর গড়ে ওঠারও প্রায় ৩শ বছর আগে থেকেই তাঁর মাজারকে ঘিরে ভক্তদের আগমন ও ওরশ পালনের ঐতিহ্য চলে আসছে।
মুঘল, পাঠান, সুলতানি, ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের গত পাঁচ দশকেও নিয়মিতভাবে এই ওরশ অনুষ্ঠিত হয়ে এসেছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
চলতি বছর খাজা শরফুদ্দিন চিশতির ওরশ শুরু হওয়ার কথা ছিল শুক্রবার থেকে। এ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ভক্ত, আশেকান ও সুফি অনুসারীরা ঢাকায় আসেন।
তবে হাইকোর্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে এবার ওরশ পালনের অনুমতি দেওয়া হয়নি। ফলে ভক্তরা হাইকোর্ট এলাকার আশপাশেই অবস্থান নেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকজন ডাকসু সদস্য সর্বমিত্র চাকমার উপস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলাইপন্থি ছাত্রদের একটি অংশ মাজারে আসা কিছু ভক্তের ওপর হামলা চালায়। এ সময় কয়েকজন ভক্ত মারধরের শিকার হন বলে অভিযোগ ওঠে।
শনিবার পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে ভক্তদের ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ফেডারেশনের সাবেক নেতা মহাথেরো মুহাম্মদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।
তিনি লেখেন, শনিবার সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত তিনি হাইকোর্ট এলাকায় অবস্থান করেন এবং খাজা শরফুদ্দিন চিশতির ভক্তদের সঙ্গে কথা বলেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভক্তদের মধ্যে ছিলেন বাউল, সুফি, আলেম, নারী–পুরুষসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। কেউ এসেছেন পুরান ঢাকা থেকে, কেউ বরিশাল, চট্টগ্রাম কিংবা উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে দুই–তিন দিনের পথ পাড়ি দিয়ে।
স্ট্যাটাসে মহাথেরো লেখেন, ভক্তরা বিস্ময়ের সঙ্গে জানতে চাইছিলেন—ওরশ পালনে সরকারের কী ক্ষতি হচ্ছে এবং কেন তাদের ওপর হামলা করা হচ্ছে। তারা আরও প্রশ্ন করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কেন তাদের মারধর করলো এবং প্রশাসনের কাছে তারা কোনো প্রতিকার পাবে কি না।
তিনি লেখেন, ভক্তরা জানান—পুলিশ কিংবা অন্য কোনো পক্ষ বাধা দিলেও তারা হাইকোর্টের সামনে অবস্থান চালিয়ে যাবেন।
মহাথেরো মুহাম্মদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ভক্তদের জানান যে তিনি কোনো ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর অংশ নন এবং খাজা শরফুদ্দিন চিশতির প্রতি অনুরাগ ছাড়া তারও কোনো রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা নেই।
এ ঘটনার পর থেকে ধর্মীয় ও সামাজিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে—শত শত বছরের একটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হঠাৎ করে বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় নেওয়া হলো। একই সঙ্গে ভক্তদের ওপর বলপ্রয়োগ ও সংঘর্ষের ঘটনাও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ঘটনার বিষয়ে শনিবার রাত পর্যন্ত হাইকোর্ট কর্তৃপক্ষ বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
