নিজস্ব প্রতিবেদক
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একটি বিতর্কিত বক্তব্য ঘুরে বেড়াচ্ছে—দেশে ফিরে তিনি নাকি তাজউদ্দীন আহমদের কানে কানে বলেছিলেন, “আমি প্রধানমন্ত্রী হবো।”
এই বক্তব্যকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ানে বঙ্গবন্ধুকে ‘ক্ষমতালোভী’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টাও দেখা যায়।
তবে ঐতিহাসিক দলিল, তৎকালীন রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্য পর্যালোচনা করলে এই দাবির পেছনের বাস্তবতা ভিন্নভাবে সামনে আসে।
১৯৭২ সালের ৯ই জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লন্ডনের উদ্দেশে যাত্রা করার খবর বাংলাদেশে পৌঁছালে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম।
তিনি বলেছিলেন, “এটা আমাদের জন্য খুশির মুহূর্ত। সাড়ে ৭ কোটি মানুষ গত নয় মাস ধরে বঙ্গবন্ধুর জন্য অপেক্ষা করছেন। তিনি আজ মুক্ত। তিনি দেশে ফিরে নেতৃত্ব গ্রহণ করবেন এবং দেশ পুনর্গঠন ও এগিয়ে নিতে নেতৃত্ব দেবেন। তাঁর অসাধারণ নেতৃত্বগুণ দিয়ে বাংলাদেশকে এশিয়া ও বিশ্বের সেরা দেশের কাতারে নিয়ে যাবেন।”
এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়, বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তনকে তখনকার নেতৃত্ব রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিক অংশ হিসেবেই দেখছিল।
তবে ‘আমি প্রধানমন্ত্রী হবো’— তাজউদ্দীন কন্যা শারমিন আহমেদের মাধ্যমে এই কথাটি আলোচনায় আসে বহু বছর পর।
লেখক ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক হাসান মোরশেদ বলেন, এই কথাটি শোনা যাওয়ার দাবি করা হয় মুজিবনগর সরকারের এক কর্মচারী আলী তারেকের মাধ্যমে।
তাঁর ভাষায়, “শেখ মুজিব বিমান থেকে নেমে ট্রাকে উঠেই তাজউদ্দীন আহমদকে কানে কানে বলেছিলেন— ‘আমি কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হবো।’ কথাটি নাকি আলী তারেক শুনে ফেলেন। বহু বছর পর তাজউদ্দীন আহমদের কন্যার সম্পাদিত একটি বইয়ে এই বর্ণনা আসে।”
তবে হাসান মোরশেদ মনে করেন, এই বক্তব্যকে ক্ষমতালোভের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা ঐতিহাসিক বাস্তবতার বিকৃতি।
তিনি বলেন, “অনেকে ভুলে যান যে, শেখ মুজিব যখন দেশে ফিরছেন, তখন তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল তাঁকে রাষ্ট্রপতি ও যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করেই সরকার গঠিত হয়েছিল। তাঁর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম দায়িত্ব পালন করছিলেন। সেই সরকার ছিল রাষ্ট্রপতি শাসিত। অর্থাৎ শেখ মুজিবই তখন রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান।”
গবেষকদের মতে, বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার পর রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা বহাল রাখলে তাঁকে কেউ প্রশ্ন করতে পারতো না। কিন্তু তিনি দুদিনের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা বাতিল করে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় যান এবং নিজে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
হাসান মোরশেদের ভাষায়, “এর মাধ্যমে শেখ মুজিব নিজের ক্ষমতা কমিয়ে সংসদকে ক্ষমতাশালী করেছিলেন। তিনি যদি রাষ্ট্রপতি থাকতেন, তখন কেউ কিছু বলতো না। তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়ে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ বেছে নিয়েছিলেন।”
এদিকে, এই ‘কানে কানে বলা’ বক্তব্যকে গুজব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা শারমিন আহমেদের ভূমিকার কথাও আলোচনায় এসেছে।
সমালোচকদের মতে, তিনি এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক ব্যাখ্যার রূপ দেন। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট সরকার পতনের পর তিনি গণমাধ্যমে বলেন, “শেখ হাসিনা তাঁর পিতা শেখ মুজিবের মতোই দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন।”
এই মন্তব্যকে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখছেন রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা।
ইতিহাসবিদদের মতে, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সময় বাংলাদেশ রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থার অধীনে ছিল। তাঁর ফিরে এসে সংসদীয় গণতন্ত্রে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নয়, বরং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও সাংবিধানিক শাসন প্রতিষ্ঠারই প্রতিফলন।
এই প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু-সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরে বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হতে চাননি। তিনি শুধু চেয়েছিলেন মানুষের মাঝে থাকতে।”
