নিজস্ব প্রতিবেদক
একসময় তীব্র বিরোধিতা ও পরিবেশবাদীদের লংমার্চ, প্রতিবাদ কর্মসূচি এবং বিভিন্ন পত্রিকায় সমালোচনার মুখে পড়া রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহে শীর্ষস্থান দখল করেছে।
আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগে নির্মিত এই ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট গত ডিসেম্বর মাসে ৬৪০ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে টানা দ্বিতীয় মাসের মতো দেশের সকল বিদ্যুৎ উৎপাদকের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছে।
প্রকল্প কর্তৃপক্ষের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ডিসেম্বরে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১১.৫ শতাংশ এসেছে এই কেন্দ্র থেকে। এর আগে নভেম্বরে ৭০০ মিলিয়ন ইউনিট উৎপাদন করে নতুন রেকর্ড গড়েছিল রামপাল।
আমদানিকৃত কয়লার ওপর নির্ভরশীল হলেও আল্ট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি এবং আধুনিক পরিবেশ সুরক্ষা ব্যবস্থা (যেমন ফ্লু-গ্যাস ডি-সালফারাইজেশন, উন্নত চিমনি এবং জিরো লিকুইড ডিসচার্জ সিস্টেম) ব্যবহার করে কেন্দ্রটি স্থিতিশীল ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে বলে দাবি করা হয়েছে।
২০১০ সালে ভারতের এনটিপিসি এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের যৌথ উদ্যোগে শুরু হওয়া এই প্রকল্প সুন্দরবনের মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হওয়ায় শুরু থেকেই ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো, তেল-গ্যাস-বন্দর রক্ষা কমিটির নেতা আনু মুহাম্মদসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা দাবি করেন, কয়লার ছাই, বর্জ্য এবং জাহাজ চলাচলের কারণে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইউনেস্কোসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রকল্পটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সুপারিশ করেছিল। লংমার্চ, মানববন্ধন এবং আদালতে মামলা পর্যন্ত গড়ায় এই প্রতিবাদ।
বাংলাদেশকে বিদ্যুৎ এ স্বয়ং সম্পুর্ন করার প্রত্যয়ে শেখ হাসিনা সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কারনে প্রকল্পটি নির্মাণ সম্পন্ন হয় এবং ২০২২-২৩ সালে ধাপে ধাপে উৎপাদন শুরু হয়। কয়লা সংকট এবং ডলার সংকটের কারণে মাঝে কয়েকবার বন্ধ হলেও বর্তমানে কেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রায় ২ লাখ টন কয়লার মজুত রয়েছে, যা আসন্ন রমজান মাসেও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করবে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, রামপালের সাফল্য দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করেছে এবং শিল্পোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে পরিবেশবাদীরা এখনও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন যে দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবনের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, একসময়ের বিতর্কিত এই কেন্দ্রটিই এখন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের একটি মূল স্তম্ভ হয়ে উঠেছে।
