ফেলানির মৃত্যুর দেড় দশক: ইউনূস আমলে ২০২৫ সালেই ৫ বছরে সর্বোচ্চ সীমান্তহত্যা, নিহত ৩৪

ফেলানির মৃত্যুর দেড় দশক: ইউনূস আমলে ২০২৫ সালেই ৫ বছরে সর্বোচ্চ সীমান্তহত্যা, নিহত ৩৪
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিন্যাস ও মানবিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রতিশ্রুতি দিয়েও বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তে প্রাণহানি কমাতে পারেনি অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকার—এমন অভিযোগ উঠেছে মানবাধিকারকর্মী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের তরফ থেকে। তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ২০২৫ সালের পরিসংখ্যানে, যেখানে গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি নাগরিক সীমান্তে নিহত হয়েছেন।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সীমান্তে ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন, যা ২০২১ থেকে ২০২৫ সময়কালের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই পরিস্থিতি সামনে এসেছে ২০১১ সালে কিশোরী ফেলানি খাতুন হত্যাকাণ্ডের ১৫ বছর পূর্তির প্রেক্ষাপটে—যে ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সীমান্ত হত্যার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

২০১১ সালের ৭ই জানুয়ারি কুড়িগ্রামের অনন্তপুর সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে মারা যায় ফেলানি। সে তার পিতার সাথে দীর্ঘদিন ভারতে অবৈধভাবে বসবাস করে আসছিল। বিয়ে ঠিক হওয়ায় সে তার পিতাকে নিয়ে গোপনে সীমান্তের কাঁটাতার ডিঙিয়ে দেশে প্রবেশ করার সময় কাঁটাতারে ফেলানির জামা আটকে গেলে চিৎকার করে। চোরাকারবারি ভেবে বিএসএফ গুলি চালায়। ফেলানির পিতা নিরাপদ সীমান্ত ডিঙাতে পারলেও গুলিতে নিহত হয় ফেলানি। কাঁটাতারে ঝুলন্ত ফেলানির মরদেহের ছবি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়লে নিন্দার ঝড় ওঠে।

ফেলানি হত্যার ১৫ বছর পূর্তিতে আবারও প্রশ্ন উঠছে—সীমান্ত হত্যা বন্ধে দুই দেশের প্রতিশ্রুতি কতটা কার্যকর হয়েছে।

সীমান্তে প্রাণহানি বন্ধে অবিলম্বে কঠোর কূটনৈতিক উদ্যোগ, যৌথ নজরদারি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসরণ করা জরুরি হলেও ইউনূস সরকার এসব পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ বলে দাবি করেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংকলিত তথ্যে দেখা যায়, সাম্প্রতিক ৫ বছরে সীমান্তে বাংলাদেশি নিহতের সংখ্যা ছিল- ২০২১ সালে ১৮ জন, ২০২২ সালে ২৩ জন, ২০২৩ সালে ৩১ জন, ২০২৪ সালে ৩০ জন এবং ২০২৫ সালে ৩৪ জন।

এই হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালেই গত ৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিক সীমান্তে প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের অধিকাংশই বিএসএফের গুলিতে মারা গেছেন। কিছু ক্ষেত্রে নির্যাতন, ধাওয়া বা সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে মারধরের অভিযোগও রয়েছে।

এর আগে ২০২০ সালে সীমান্তে নিহতের সংখ্যা আরও বেশি ছিল। সে বছর ৪৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হন। তবে ২০২১ সালের পর কয়েক বছর তুলনামূলকভাবে সংখ্যা কিছুটা কমলেও ২০২৩ সাল থেকে আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, সীমান্তে গবাদিপশু পাচার, অবৈধ পারাপার, কৃষিকাজ কিংবা সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় চলাচলের সময় এসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে। অনেক ঘটনায় নিহতরা নিরস্ত্র ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সীমান্ত হত্যা নিয়ে কূটনৈতিক পর্যায়ে একাধিকবার আলোচনা হলেও বাস্তবতা বদলায়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সীমান্ত হত্যা বন্ধে ‘নন-লেথাল’ পদ্ধতি ব্যবহারের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকর বাস্তবায়ন হয়নি।

এ বিষয়ে নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক আমিনুল হক বলেন, “ইউনূস সরকার মুখে ভারতবিরোধিতা করলেও সীমান্ত হত্যা বন্ধে বাস্তব কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ফলে ২০২৫ সালে হঠাৎ করেই সীমান্ত হত্যার সংখ্যা বেড়েছে।”

তিনি বলেন, “মুখে মুখে ভারতবিরোধিতা না করে ইস্যুভিত্তিক কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান দরকার। হেইট স্পিচ বা বাগাড়ম্বর দিয়ে দ্বিপাক্ষিক সমস্যার সমাধান হয় না। সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে হলে নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে।”

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, সীমান্তে নিহতদের অধিকাংশই দরিদ্র মানুষ। তাদের পরিবার ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অনেক ঘটনায় তদন্ত হলেও দোষীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দেখা যায় না।

Visited 26 times, 1 visit(s) today