ছায়ানট ভবনে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন: কোন ‘কালচারাল ন্যারেটিভ’ সৃষ্টির বাঁধা ছায়ানট?

ছায়ানট ভবনে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন: কোন ‘কালচারাল ন্যারেটিভ’ সৃষ্টির বাঁধা ছায়ানট?
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক::

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুর খবরে সৃষ্ট ক্ষোভ-বিক্ষোভের মধ্যে রাজধানীর ধানমন্ডিতে বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান ছায়ানট ভবনে হামলা, ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। বাঙালির শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিরোধী জুলাই যোদ্ধারা মার্চ করে “আল্লাহ আকবর” স্লোগান যোগে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাট করেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। প্রকাশ্যে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাট করা হলেও ইউনূস সরকারের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দাড়িয়ে দেখছে বলে অভিযোগ প্রত্যক্ষদর্শীদের।

বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর একদল বিক্ষোভকারী জঙ্গী ধানমন্ডির শংকর এলাকায় অবস্থিত সাততলা ছায়ানট ভবনে ঢুকে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শী ও টেলিভিশন ফুটেজে দেখা যায়, হামলাকারীরা ভবনের একের পর এক তলায় প্রবেশ করে প্রতিটি কক্ষে নির্বিচারে ভাঙচুর চালায়।

নিচতলায় থাকা সব আসবাবপত্র ও বাদ্যযন্ত্র ভেঙে ফেলা হয়। বিভিন্ন তলায় থাকা সংগীতের সরঞ্জাম, চারুকর্ম ও শিল্পকর্ম ধ্বংস করা হয়। মিলনায়তনে মনিটরিং সিস্টেম, লাইট, ফ্যানসহ যা কিছু ছিল, সবই চুরমার করা হয়। কক্ষগুলোতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছিন্নভিন্ন করে ফেলা হয়।

চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের লাইভ ভিডিওতে দেখা যায়, তিন তলা পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি কক্ষ ভাঙচুর করা হয়েছে। ছায়ানট সঙ্গীতবিদ্যায়তন ও সেখানে পরিচালিত বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ এবং অফিসগুলোতেও হামলা চালানো হয়। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কক্ষও রেহাই পায়নি—আলমারির কাচ ভাঙা, চেয়ার-টেবিল ওলটপালট এবং জানালা ও ফ্যান ভেঙে ফেলার চিত্র দেখা গেছে।

মোল্লা উমরের নেতৃত্বে তালিবানরা আফগানিস্থান দখল করার পরে এভাবেই একে একে ভাঙ্গা হয়েছিল আফগানিস্থানের সমস্ত ঐতিহাসিক স্থাপনা ও কৃষ্টি কালচারের সাথে যুক্ত স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান।

হামলাকারীদের অনেককে মুখে কাপড় বাঁধা ও হেলমেট পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। ভবন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তারা ভবনের সামনে আগুন ধরিয়ে দেয়।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে হামলার সময় বিক্ষোভকারীদের বলতে শোনা যায়, বাংলাদেশে ভারতীয় সংস্কৃতি চর্চার জায়গা নেই।
ধানমন্ডি থানার দায়িত্বরত কর্মকর্তা মিথুন সিংহ জানান, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার কিছু সময় পরই ছায়ানট ভবনে হামলা হয়। পুলিশের ধারণা, একই বিক্ষোভকারী গোষ্ঠী দুটি হামলাতেই জড়িত। খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

হামলার পর ছায়ানট ভবনে পরিচালিত ছায়ানট সঙ্গীতবিদ্যায়তনের সব ক্লাসসহ সংগঠনের যাবতীয় কার্যক্রম পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। রাত সাড়ে ৩টার দিকে ছায়ানটের ফেসবুক পেজে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

১৯৬১ সালে বাঙালিকে আপন সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত ছায়ানট এর আগেও প্রাণঘাতী হামলার শিকার হয়েছে। ২০০১ সালে বাংলা নববর্ষের দিনে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় ১০ জন নিহত হন।

তবু বারবার হামলার মুখেও দমে যায়নি প্রতিষ্ঠানটি। সাংস্কৃতিক পুরোধা ওয়াহিদুল হক ও সন্‌জীদা খাতুনের নেতৃত্বে ছায়ানট দীর্ঘদিন ধরে বাঙালি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রভাগে রয়েছে।

এবারের হামলার পরও ছায়ানটের সদস্য, শিক্ষার্থী ও শুভানুধ্যায়ীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন—এই আঘাতেও ছায়ানটের সাংস্কৃতিক লড়াই থামবে না।

Visited 11 times, 1 visit(s) today