বিশেষ প্রতিবেদক
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনকালে (আগস্ট ২০২৪ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬) বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা বা বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলার খবর প্রায় শোনা যায়নি। শুধু হিজবুত তাহরির নামক নিষিদ্ধ সংগঠনের আইএস আর পতাকা যোগে শো-ডাউন ছাড়া আর জুলাই আন্দোলনকারীদের মব কালচার বা প্রেশারগ্রুপ কর্মকান্ড ছাড়া।
সরকার ও এর সমর্থক মহল বারবার দাবি করেছে—দেশে জঙ্গি নেই, শেখ হাসিনা সরকারের ‘জঙ্গিবাদের নাটক’ শেষ হয়েছে। অথচ ফেব্রুয়ারিতে সরকার পরিবর্তনের পর বিএনপি ক্ষমতায় আসার কয়েক মাসের মধ্যেই একাধিক বোমা উদ্ধার ও বিস্ফোরণের ঘটনা সামনে এসেছে। এই বৈপরীত্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে: সত্যিই কি সেই দেড় বছরে জঙ্গিবাদ শূন্যে নেমে গিয়েছিল, নাকি পর্দার আড়ালে অন্য কোনো বাস্তবতা কাজ করছিল?
যাচাইযোগ্য তথ্য কী বলে?
অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর কারা বিভাগের ডিজি নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে চার মাসের মধ্যেই ১৭৪ জন জঙ্গি এবং ১১ জন শীর্ষ দুষ্কৃতী জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। ABT, JMB, Hizb-ut-Tahrir-সহ বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা—যাদের মধ্যে জসিমুদ্দিন রাহমানির মতো পরিচিত নামও ছিল—এই তালিকায় ছিলেন। অনেক মামলায় আদালত জামিন দিয়েছিলেন, আর কিছু ক্ষেত্রে অগস্ট ২০২৪-এর কারাগার ভাঙার ঘটনায় পলাতকরাও মুক্ত পরিবেশে ছিলেন।
এই সময়ে বড় কোনো সিরিজ বোমা হামলা বা জঙ্গি সংগঠনের দায়স্বীকৃত হামলার খবর প্রকাশ পায়নি।
সরকারি ভাষ্য ছিল—হাসিনা আমলের অনেক মামলাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা দুর্বল প্রমাণভিত্তিক ছিল। তাই ‘নিরীহ’ বা ‘ভোলাভালা মুমিন মুসল্লি ও ইসলামপন্থী’দের জঙ্গি সাজিয়ে আটক রাখা অভিযুক্তদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। আইনও উপদেষ্টা ড আসিফ নজরুল ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বিভিন্ন সময়ে বলেওছিলেন যে বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি নেই। প্রধান উপদেষ্টা ড ইউনূসের মুখপাত্র ও প্রেস সচিব শহফিকুল আলম বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে জঙ্গি আক্রমণ আর জঙ্গি আটকের ঘটনাকে শেখ হাসিনা সরকারের নাটক হিসাবে মন্তব্য করেছেন।
অথচ, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর (ফেব্রুয়ারি ২০২৬) বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে অন্তত ১১টি বোমা/বিস্ফোরক-সম্পর্কিত ঘটনার কথা উঠে এসেছে। কেরানীগঞ্জের মাদ্রাসায় বিস্ফোরণ থেকে শুরু করে সাভার, মতিঝিল, আশুলিয়ায় পাইপ বোমা ও প্রেশার কুকার বোমা উদ্ধার—তদন্তসংশ্লিষ্টরা এগুলোকে নব্য জেএমবির মতো একই গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত করেছেন। সিটিটিসি কর্মকর্তারা বলেছেন, বড় নাশকতার পরিকল্পনা থাকতে পারে।
কেন ইউনূস আমলের দেড় বছরে ‘জঙ্গি নেই’ বলে মনে হয়েছিল, বিশ্লেষকরা কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ তুলে ধরছেন:
১. নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও তদারকির পরিবর্তন
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে জঙ্গি দমনে “জিরো টোলারেন্স নীতি” প্রয়োগের মাধ্যমে জঙ্গি ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানো হয়েছিল। তারই ফলস্বরুপ আন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পরে তেমন কোন জঙ্গি গোষ্ঠি সক্রিয় না থাকার কারনে এবং পূর্বেই বাংলাদেশে বিদ্যমান জঙ্গি নেটওয়ার্ক ভেঙ্গে দেয়ার কারনে জঙ্গিবাদের তেমন কোন প্রকোপ দেখা যায় নাই।
২. মুক্তিপ্রাপ্তদের ‘নিষ্ক্রিয়’ অবস্থা
ড ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে মুমিন ও ইসলামপন্থী আখ্যা দিয়ে যে সকল জঙ্গিদের মুক্তি দেয়া হয়েছিল, তারা অনেকেই তাৎক্ষণিকভাবে সক্রিয় হননি। নেটওয়ার্ক পুনর্গঠন, অর্থ সংগ্রহ বা নতুন পরিকল্পনায় করার জন্য তারা সময় নিয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাস পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকায় আর আইনশৃংখলা বাহিনী দুর্বল থাকার সুযোগটাকে তারা কাজে লাগিয়েছে নিজেদের সংখ্যা, সংগঠন ও নেটওয়ার্ক তৈরিতে। দেড় বছর সেই ‘প্রস্তুতি পর্ব’ সচারুভাবে করতে পারার পরপরই শক্তি অর্জন করে তারা সক্রিয় হয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে একই গোষ্ঠীর সংযোগের যে তথ্য তদন্তকারীরা দিচ্ছেন, তা এই যুক্তিকে জোরালো করে।
৩. রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আশ্রয় প্রশ্রয়
অন্তর্বর্তী সরকারের মূল ফোকাস ছিল সংস্কার, নির্বাচন এবং পূর্ববর্তী সরকারের বিরুদ্ধে বিচার। নিরাপত্তা ইস্যু তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে। জুলাই পরবর্তি মব নৈরাজ্য, আওয়ামীলীগ নিধনের কাজে ব্যাস্ত ছিল আন্দোলনকারীরা, এই ব্যাস্ততার সময়ে জঙ্গি আদর্শে বিশ্বাসীরাও জড়িয়ে গিয়েছিল। যার প্রথম প্রকাশ পায় বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংবাদপত্র দৈনিক প্রথম আলো আর দ্যা ডেইলি স্টার অফিসে হামলা ও অগ্নিকান্ডের ঘটনায়।
৪. তথ্য প্রবাহ ও রিপোর্টিংয়ের বাস্তবতা
কিছু সমালোচক বলেন, ঘটনা ঘটলেও তা প্রকাশ বা তদন্তে গুরুত্ব পায়নি অথবা জুলাই আন্দোলনকারীদের প্রতিবাদ বা প্রেশার গ্রুপের প্রতিবাদী আচরণ হিসাবে স্নেহের দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। আবার কেউ কেউ দাবি করেন—সত্যিই সেই সময়ে তৎপরতা কমে গিয়েছিল, কারণ পূর্ববর্তী কঠোর দমন নীতির প্রভাব এখনো কাটেনি।
এই ‘শূন্য তৎপরতা’র দাবিকে অনেকেই অতিরঞ্জিত বলে মনে করেন। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ কোনো সরকারের আমলেই সম্পূর্ণ নির্মূল হয়নি। হাসিনা আমলেও ঘটনা ঘটেছে, বিএনপি-জামায়াত আমলে সিরিজ বোমা হামলার নজির আছে। আওয়ামীলীগ আমলে দেয়ার করা মামলায় প্রমাণ দুর্বল হলেও যে, ইউনূস সরকারের মুক্তি দেওয়া ব্যক্তিদের সবাই যে সক্রিয় জঙ্গি বা জঙ্গি নেটওয়ার্ক বা আদর্শ ধারন করে, সেটা সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে প্রমাণিত।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে সরাসরি ইউনূস সরকারের আমলে দেয়া ছাড় বা প্রশ্রয়ের কারনে জঙ্গিবাদের শেকড় শক্ত হয়ে ওঠার একটা প্রমাণ।
ইউনূস আমলের দেড় বছরে বড় জঙ্গি হামলার অনুপস্থিতি একটি বাস্তবতা। কিন্তু ‘জঙ্গি নেই’—এই সরল দাবি বাস্তবতাকে অতিরিক্ত সরলীকরণ করে। মুক্তি, নজরদারির পরিবর্তন এবং নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য পুনর্গঠন—এসব বিষয় একসঙ্গে কাজ করে থাকতে পারে। সরকার পরিবর্তনের পর ঘটনাগুলো সামনে আসাটাও ইঙ্গিত দেয় যে হুমকি কখনোই সম্পূর্ণ মিটে যায়নি।
জঙ্গিবাদ দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। ২০১৬ সালের ১লা জুলাই হোলি আর্টিজান আমলার ঘটনার পরে বিগত আওয়ামীলীগ সরকার, আইনশৃংখলা বাহিনী, র্যাব, কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় জঙ্গি অর্থায়ন, জঙ্গিবাদের বিস্তার, জঙ্গি নেটওয়ার্ক দুর্বল করা হয়েছিল। আবারো হয়তো বর্তমান সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছ তদন্ত এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমুক্ত পদক্ষেপই একমাত্র পথ।
অন্যথায় ‘নেই’ বলে দাবি করা আর ‘আছে’ বলে আবিষ্কার করার চক্র চলতেই থাকবে।
