কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতাদের মৃত্যুর ঢল: এবার গাইবান্ধায় তারিক রিফাতকে হত্যার অভিযোগ

কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতাদের মৃত্যুর ঢল: এবার গাইবান্ধায় তারিক রিফাতকে হত্যার অভিযোগ
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

গত বছরের ৫ই আগস্টের পর থেকে আওয়ামী লীগ নেতাদের গণগ্রেপ্তারের হিড়িক চলছে। আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী এবং ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের কয়েক লাখ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সেখানে গোপনে নির্যাতন চালিয়ে, গ্রেপ্তারের পূর্বে মব চালিয়ে হতাহতদের চিকিৎসা না দিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে অর্ধশত গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে। এছাড়াও নির্যাতনে আহতের সংখ্যা অন্তত কয়েক হাজার, দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

কারা হেফাজতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ‘রহস্যজনক’ মৃত্যুর ঘটনায় দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগ এবং তদন্তের দাবির মধ্যেও থামছে না মৃত্যুর মিছিল।

সর্বশেষ ২৩শে নভেম্বর, রোববার গাইবান্ধা জেলা কারাগারে মারা গেছেন গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মলীগের আহ্বায়ক ও রাজাহার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক তারিক রিফাত (৫০)।

তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পরিবারের পক্ষ থেকে ‘পরিকল্পিত হত্যা’র অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

তারিক রিফাতের পরিবার জানায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগে ভুগছিলেন এবং হৃদযন্ত্রে রিং পরানো ছিল। গত ১৭ই নভেম্বর একটি মামলায় জামিন পেয়েও জেলগেট থেকে তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

কারাগারে টানা নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে পড়লে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও চিকিৎসকদের উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ উপেক্ষা করে পুলিশ তাকে গোবিন্দগঞ্জ থানায় নিয়ে যায়। পরদিন আদালতের মাধ্যমে আবার কারাগারে পাঠানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার মৃত্যু হয়।

গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়।

এই ঘটনা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত তিন মাসে অন্তত ৮-১০ জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী কারাগারে বা পুলিশ হেফাজতে মারা গেছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিবারের অভিযোগ—সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া হয়নি, অসুস্থতার কথা জানানো সত্ত্বেও উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি এবং মৃত্যুর পর ময়নাতদন্তেও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে।

আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, “আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতাকর্মীদের টার্গেট কিলিং করা হচ্ছে, যারা দলে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন দীর্ঘদিন ধরে, তৃণমূল কর্মীদের সংগঠিত করার দক্ষতা রয়েছে, রাজপথে সক্রিয় ছিলেন—তাদেরকেই টার্গেট করা হয়েছে। জামিনের পর পুনরায় গ্রেপ্তার, চিকিৎসায় বাধা ও কারাগারে মৃত্যু—এটা এখন একটা প্যাটার্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

তারা আরও বলেন, “টার্গেট কিলিংয়ের কারণে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা শঙ্কিত এবং একইসাথে ক্ষুব্ধ। কোটির বেশি নেতাকর্মী বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে আছেন, অনেকে গা-ঢাকা দিয়েছেন। যারা এখনো কারাগারে আছেন, তাদের পরিবারের লোকজন প্রতিদিন আতঙ্কে থাকেন যে কখন কার খারাপ খবর আসবে।”

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গত সপ্তাহে এক সংবাদ সম্মেলনে এ ধরনের মৃত্যুকে ‘উদ্বেগজনক’ উল্লেখ করে বলেছিলেন, “আমাদের নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা ও সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি। এভাবে চলতে থাকলে দলের মনোবল ভেঙে পড়বে।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা-হামলা-গ্রেপ্তারের ধারা যেমন চলছে, তেমনি আওয়ামী লীগের একটি অংশকেও এখন ‘প্রতিশোধের’ শিকারে পরিণত করা হচ্ছে—যা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য মোটেই সুখকর নয়।

কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের এভাবে একে একে মৃত্যুর ঘটনা এখন শুধু দলের জন্য নয়, গোটা দেশের জন্যই একটি গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কারা হেফাজতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অস্বাভাবিক মৃত্যুর বিভিন্ন তথ্য এখানে

Visited 18 times, 1 visit(s) today