ইতালিতে গ্রামীণের শ্রমিক রপ্তানির একচেটিয়া কারবার চালাতে অবৈধ বাংলাদেশিদের ফেরত আনতে চান ড. ইউনূস?

ইতালিতে গ্রামীণের শ্রমিক রপ্তানির একচেটিয়া কারবার চালাতে অবৈধ বাংলাদেশিদের ফেরত আনতে চান ড. ইউনূস?
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সাম্প্রতিক ইতালি-সম্পর্কিত অভিবাসন নীতি নিয়ে বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে। ইতালির অবৈধ বাংলাদেশিদের দেশে ফেরত আনার বিনিময়ে বৈধ শ্রমিক পাঠানোর প্রতিশ্রুতি আদায়ের নেপথ্যে কি লুকিয়ে আছে গ্রামীণ গ্রুপের ব্যক্তিগত স্বার্থ? এমন প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকরা।

রাষ্ট্র ক্ষমতা ব্যবহার করে গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস লিমিটেডের এর অধীনে ড. ইউনূসের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স (নং- ২৮০৬) দেওয়া হয়েছে গত ২০শে মার্চ।

সমালোচকদের অভিযোগ, ড. ইউনূস নিজের প্রতিষ্ঠানকে ইতালির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ করার সুযোগ তৈরি করছেন, লাখো অভিবাসীর জীবনকে বাজি রেখে। এতে স্বার্থের সংঘাতের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে, যা দেশের অভিবাসন নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

অবৈধভাবে ইতালি যাওয়া প্রবাসীরাও দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন। তাদের ফিরিয়ে আনলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত আসতে পারে বলে শংকা অর্থনীতিবিদদের।

বিওএমইএ (বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড মাইগ্রেন্টস)-এর রেকর্ড অনুসারে, গ্রামীণের জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স নেওয়ার প্রক্রিয়ায় সরকারি স্তরে অস্বাভাবিক ত্বরান্বিত হয়েছে। এখানে ড. ইউনূসের প্রভাব কাজ করেছে বলে অভিযোগ আছে। এছাড়াও, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জনশক্তি রপ্তানিতে সরকারি চুক্তিতে গ্রামীণ জনশক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

ইতালির ক্ষেত্রে, ড. ইউনূসের নিউইয়র্কে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে বৈঠকে উঠে আসা ‘ফেরতের বিনিময়ে লিগ্যাল মাইগ্রেশন’ প্রস্তাবকে সমালোচকরা দেখছেন এই ব্যবসায়িক স্বার্থের ধারাবাহিকতা হিসেবে।

একটি এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে, যাতে অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত এবং বৈধ শ্রমিক প্রেরণের কথা বলা হয়েছে—কিন্তু এর সুবিধাভোগী কি গ্রামীণের মতো প্রতিষ্ঠান?

এটা স্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত- বলছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের গ্রুপের জন্য লাইসেন্স নেওয়া, তারপর সরকারি প্রভাব খাটিয়ে বিদেশি চুক্তি নিশ্চিত করা—এটা নৈতিকতার লঙ্ঘন বলে মনে করেন তারা।

ইতালিতে লাখো অবৈধ বাংলাদেশিকে ফেরত আনার কথা বলে আসলে গ্রামীণ জনশক্তির একচেটিয়া বাজার তৈরি করা হচ্ছে। এতে দেশের অন্যান্য রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো বঞ্চিত হবে, আর অভিবাসীরা পড়বে অনিশ্চয়তায়।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এ ঘটনায় বেশ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

বায়রার সদস্য একটি এজেন্সির মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “গ্রামীণের এই প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে মালয়েশিয়া এবং সৌদি আরবের সঙ্গে সরকারি সহায়তায় চুক্তি পেয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি।

ইতালির প্রেক্ষাপটে, ২০২৪ সালে ১৪ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি লিবিয়া হয়ে অবৈধভাবে পৌঁছেছে, যাদের অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছে। ড. ইউনূসের বক্তব্যে এদের ‘ট্র্যাজিক’ বলা হলেও, ফেরত প্রক্রিয়া শুরু হলে পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটবে। এই অভিবাসীদের পরিবারগুলো পথে বসে যাবে।

অর্থনীতিবিদ ড. মামুনুর রশীদ বলেন, “রেমিট্যান্সের ৬ শতাংশ জিডিপি অবদান রাখে এই অভিবাসীরা। কিন্তু এই চুক্তির মাধ্যমে গ্রামীণের মতো প্রতিষ্ঠান লাভবান হলে, সাধারণ এজেন্সিগুলোর খরচ বাড়বে, অভিবাসীরা বেশি ফি দিতে বাধ্য হবে। প্রধান উপদেষ্টার ব্যক্তিগত ব্যবসা এখানে মিশে গেলে জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয়।”

অভিবাসী অধিকারকর্মী ফরিদা আক্তার যোগ করেন, “গ্রামীণের লাইসেন্স নেওয়ার পর থেকে সরকারি চাপে অন্যান্য এজেন্সি বাদ পড়ছে। ইতালিতে শ্রমিক রপ্তানির চুক্তি যদি গ্রামীণকে দেওয়া হয়, তাহলে এটা হবে ক্ষমতার অপব্যবহার। অবৈধদের ফেরত আনার আড়ালে ব্যক্তিগত লাভের খেলা চলছে—যুবকদের জীবনকে হুমকিতে ফেলে। অন্তর্বর্তী সরকারকে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, নয়তো এই নীতি বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে।”

সরকারের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছেন, চুক্তি ‘জাতীয় স্বার্থে’ এবং সেফ মাইগ্রেশনের জন্য। কিন্তু গ্রামীণের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ড. ইউনূসের দপ্তর চুপ করে যায়।

সমালোচকরা দাবি করছেন, স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে এই স্বার্থের সংঘাত যাচাই করা দরকার। অন্যথায়, অভিবাসন নীতি শুধু একটি ব্যক্তির ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের অংশ হয়ে উঠবে, দেশের লাখো যুবকের স্বপ্নকে ছিনিয়ে নিয়ে। এই বিতর্ক এখনও চলছে, কিন্তু স্বচ্ছতার অভাবে জনগণের সন্দেহ বাড়ছে।

Visited 24 times, 1 visit(s) today