আইসিটি আইনের ধারাবাহিক সংশোধন: বিচার নাকি প্রতিশোধের নেশায় বিভোর ইউনূস সরকার?

আইসিটি আইনের ধারাবাহিক সংশোধন: বিচার নাকি প্রতিশোধের নেশায় বিভোর ইউনূস সরকার?
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

কথিত জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত সহিংসতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে গিয়ে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩’-এ এক বছরের মধ্যে চারবার সংশোধনী এনেছে ইউনূস সরকার। এ ধরনের ধারাবাহিক সংশোধন নিয়ে আইনি বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে এটি কি ন্যায়বিচার নিশ্চিতে, নাকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে ব্যবহৃত একটি হাতিয়ার? বিশেষ করে আওয়ামী লীগ, মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক শক্তির নিশ্চিহ্ন করতেই এমন সংশোধন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তবে সরকার ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বারবার বলছে আইনটি যুগোপযোগী করতেই এসব সংশোধনী আনা হয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য আইনকে একপাক্ষিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং এতে বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

চার দফা সংশোধন, চারটি বিতর্ক

ইতোমধ্যে চারবার সংশোধন করা হয়েছে আইনটি। এই সংশোধনের মাধ্যমে দেশের বাইরের ঘটনায়ও বিচার করার ক্ষমতা ট্রাইব্যুনালের হাতে তুলে দেওয়া হয়। যে কোনো দেশের নাগরিক, এমনকি সেনা, পুলিশ, গোয়েন্দা ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদেরও বিচারের আওতায় আনা হয়।

দ্বিতীয় সংশোধনী (ফেব্রুয়ারি ২০২৫)

আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের সময় কমিয়ে ৬ সপ্তাহ থেকে ৩ সপ্তাহ করা হয়। যা মানবতাবিরোধী বলে সুধীজন মনে করেন। পাশাপাশি ট্রাইব্যুনালকে সম্পদ জব্দ, বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং অনুমতি ছাড়াই তল্লাশি ও জব্দের ক্ষমতা দেওয়া হয়। দ্রুত বিচার শেষ করার নামে আসামিপক্ষের প্রস্তুতির সুযোগ সীমিত করা নিয়ে সমালোচনা ওঠে।

তৃতীয় সংশোধনী (মে ২০২৫)

এ সংশোধনীর মাধ্যমে রাজনৈতিক দল বা সংশ্লিষ্ট সংগঠনের বিরুদ্ধেও মামলা করার সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা পূর্ববর্তী আইনে ছিল না। এতে রাজনৈতিকভাবে ‘অপছন্দের’ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে বিচার প্রক্রিয়ায় টেনে আনার পথ সুগম হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। মূলত আওয়ামী লীগ, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করতেই এমন সংশোধন আনা হয়েছে।

চতুর্থ ও সর্বশেষ সংশোধনী (অক্টোবর ২০২৫)

এই সংশোধনীর সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল হলেই তিনি জনপ্রতিনিধি বা সরকারি চাকরির যোগ্যতা হারাবেন। এমনকি ট্রাইব্যুনাল থেকে খালাস না পাওয়া পর্যন্ত নির্বাচনেও অংশ নিতে পারবেন না। এর ফলে শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি, ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সব পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। মূলত আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতেই এই সংশোধন বলে মনে করেন সুধী মহল।

বিশেষ করে এই সংশোধনী ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা পেয়েছে, অর্থাৎ আইন প্রণয়নের আগের ঘটনাতেও তা প্রযোজ্য হবে যা সাধারণ আইনি নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মত দিয়েছেন অনেক আইনজ্ঞ।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও আইনি বিশ্লেষকরা বলছেন, দ্রুত ও বারবার আইনের পরিবর্তন এবং ভিন্নমতের রাজনীতিকদের বিচারের আওতায় আনার প্রবণতা স্পষ্ট করে যে, এই বিচার প্রক্রিয়া ন্যায়বিচারের চেয়ে রাজনৈতিক প্রতিশোধের অংশ বেশি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র আইনজীবী বলেন, আইন যেন ব্যক্তিবিশেষকে লক্ষ্য করে সাজানো হচ্ছে। এটি যদি বিচার হতো, তাহলে এতো তড়িঘড়ি করে চারবার আইন বদলের প্রয়োজন হতো না।

সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল গত বছর ১৪ আগস্ট ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘জুলাই গণহত্যার বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হবে। এরপর থেকেই আইনটিতে ধারাবাহিক পরিবর্তন দেখা যায়, যা অনেকের চোখে একটি রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযান হিসেবেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০১০ সালে গঠিত ট্রাইব্যুনাল মূলত ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য ব্যবহৃত হলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে একই কাঠামো ব্যবহার করে বর্তমান ও অতীত বিরোধীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এতে আইনের ব্যবহার প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির বিরুদ্ধেই এই আইনটি এখন ব্যবহার করা হচ্ছে।

এক বছরের মধ্যে চারবার আইন পরিবর্তন, বিচারাধীন অবস্থাতেই নির্বাচনী অযোগ্যতা আরোপ এবং ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা এসবই ইঙ্গিত করছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এখন রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করার একপাক্ষিক মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এতে যেমন বিচার ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি গণতান্ত্রিক পরিবেশও আরও সংকুচিত হয়ে পড়ছে বলে মনে করেন আইনজ্ঞরা।

Visited 5 times, 1 visit(s) today