নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা শহরের সড়কজুড়ে বিশৃঙ্খলা কোনোভাবেই কমানো যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় বসে যাওয়া ইউনূস সরকারের সময় রাজধানীর রাস্তায় দেখা দিয়েছে চরম ট্রাফিক বিশৃঙ্খলা, যা দিনে দিনে দুর্বিষহ রূপ নিচ্ছে। আইনশৃঙলা বাহিনী মনোবল হারানোয়ও এর উপর প্রভাব পড়েছে।
কলাবাগান থেকে গুলশানে কর্মস্থলে যাতায়াতকারী বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা প্রতিদিন এ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন। তিনি জানান, আগে সোনারগাঁও মোড় পেরোতে যেখানে ১০ মিনিট লাগত, সেখানে এখন সময় লাগছে দ্বিগুণেরও বেশি। ২০ মিনিট বা তার বেশি। কারণ, সোনারগাঁও মোড়ের পান্থপথ থেকে এফডিসি অভিমুখী পথটি হঠাৎ করে বন্ধ করে দিয়েছে ট্রাফিক বিভাগ।
এরকম এক নয়, অন্তত ৬৯টি মোড়ে ট্রাফিক ডাইভারশন চালু করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। কিন্তু এসব পরিবর্তনের ফলে ঢাকার ব্যস্ততম সড়কগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে নৈরাজ্য, বাড়ছে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ।
সরকার বদলের পর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তহীনতা এবং সমন্বয়হীন নীতির ফলে ট্রাফিক পুলিশরা মাঠপর্যায়ে কার্যত দিকনির্দেশনা ও সহায়তা পাচ্ছেন না। তাদের মনোবলে ভাঙন ধরেছে। অনেক জায়গায় দেখা গেছে, ট্রাফিক সদস্যরা দিশেহারা হয়ে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছেন, কোথাও আবার নিরাপত্তাহীনতাও দেখা দিয়েছে।
সড়ক ব্যবহারকারীরা বলছেন, যেখানে কেউ কেউ ডাইভারশনের ফলে সুবিধা পাচ্ছেন, সেখানে বেশিরভাগ মানুষ পড়েছেন ভোগান্তিতে। বিশেষ করে যানবাহনের চাপে ভেঙে পড়েছে ডাইভারশন ব্যবস্থার কার্যকারিতা।
যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ডাইভারশন ঢাকার মতো যানজটে ভরা শহরের জন্য উপযোগী নয়।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, ‘যা হচ্ছে তা বিজ্ঞানসম্মত হতে পারে, কিন্তু বাস্তবভিত্তিক নয়। এত যানবাহনের চাপে এ ডাইভারশনগুলো কেবল জনভোগান্তিই বাড়াচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশ যদি জানত এটা কীভাবে কাজ করবে না, তাহলে তারা এখন যে বদনাম কুড়াচ্ছে, তা হতো না।’
ঢাকার সড়ক ব্যবস্থাপনায় কাজ করছে একাধিক সংস্থা, কিন্তু সরকারের কোনো কার্যকর সমন্বয় নেই। বিষয়টি স্বীকার করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী শেখ মইনউদ্দিনও।
তিনি বলেন, ‘ডিএমপি আমাদের সঙ্গে সমন্বয় না করে নিজেদের পর্যবেক্ষণেই এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি ট্রাফিক স্টাডি ছাড়াই করা হয়েছে, যার ফলে সমস্যা হচ্ছে।’
ইউনূস সরকার রাজধানীতে ‘পরীক্ষামূলক’ নানা উদ্যোগ নিচ্ছে, যার বাস্তবায়ন কার্যত এক বিশৃঙ্খলার নামান্তর। এর অংশ হিসেবে প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বসানো হয়েছে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি। কিন্তু বাস্তবে এসব সিগন্যাল কাজ করছে না, আর চালু থাকলেও তার প্রতি কারো ভরসা নেই।
বাংলামোটর, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, ইন্টারকন্টিনেন্টালসহ সাতটি মোড়ে সিগন্যাল থাকলেও যান নিয়ন্ত্রণ এখনো হচ্ছে ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায়। ফলে সিগন্যাল আর পুলিশের নির্দেশনার দ্বৈততা সৃষ্টি করছে বিভ্রান্তি। পথচারী ও চালকদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে দ্বিধা, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর দাবি, ‘সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে সমাধান করা হচ্ছে। মানুষ বহুদিন সিগন্যাল দেখেনি, এখন মানিয়ে নিতে সময় লাগছে।’ তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা—মানুষ ধৈর্য হারাচ্ছে, এবং ঢাকার রাস্তায় নেমে এসেছে নৈরাজ্যের অন্ধকার।
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. জিল্লুরের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকেও ট্রাফিক বিশৃঙ্খলা এবং ডাইভারশন বিষয়ে কোনো পরিষ্কার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
