নিজস্ব প্রতিবেদক
আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
সমালোচকরা দাবি করছেন, সরকার নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শভিত্তিক সমর্থকদের পুনর্বহাল, পক্ষপাতমূলক নিয়োগ এবং প্রশাসনিক পদোন্নতির মাধ্যমে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে পক্ষপাতদুষ্ট করার একটি সুনির্দিষ্ট মহাপরিকল্পনা গড়ে তুলছে। এই পরিকল্পনার লক্ষ্য হতে পারে নির্বাচনী ফলাফলকে সরকারের পক্ষে সুনির্দিষ্টভাবে প্রভাবিত করা এবং নিজেদের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণে সুবিধা লাভ।
সাম্প্রতিক তিনটি ঘটনা এই অভিযোগকে আরও জোরদার করেছে, যা নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও সুষ্ঠতার উপর গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
প্রথম ঘটনা: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে বৃহৎ সংখ্যক নিয়োগ
সোমবার (১৮ আগস্ট) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির সভা শেষে সাংবাদিক ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, ত্রয়োদশ নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীতে মোট ২৫ হাজার ৮৭১ জন নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশে ১৫ হাজার ৮৫১ জন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে (বিজিবি) ৪ হাজার ৪৬৯ জন, কারা, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সে ১ হাজার ৭৬২ জন অন্তর্ভুক্ত।
এই নিয়োগগুলো সাব-ইন্সপেক্টর থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত বিস্তৃত এবং শূন্যপদ ও নতুন সৃষ্ট পদে ভরা হয়েছে।
সমালোচকরা অভিযোগ করছেন, এই বৃহৎ সংখ্যক নিয়োগে শিবির ও ছাত্রদলের প্রার্থীদের অস্বাভাবিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, যা নির্বাচনী দায়িত্বে পক্ষপাত সৃষ্টির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এই নতুন কর্মকর্তারা নির্বাচনী কেন্দ্রে কাজ করলে সরকারের পক্ষে ফলাফল প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে, যা নিরপেক্ষতার পরিপন্থী।
দ্বিতীয় ঘটনা: অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি
প্রশাসনিক ক্যাডারের পর অন্যান্য ক্যাডারে ৭৮ অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির সুপারিশ একটি নতুন বিতর্কের সূত্রপাত করেছে। পর্যালোচনা কমিটির সিদ্ধান্তে গ্রেড-১ পদে ১২ জন, গ্রেড-২-এ ৩২ জন এবং গ্রেড-৩-এ ৩৪ জন কর্মকর্তার নাম রয়েছে, যারা ইতিমধ্যে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন।
‘ভূতাপেক্ষ’ পদোন্নতি বলতে পূর্বের কোনো তারিখ থেকে কার্যকর করা বোঝায়, যা রাজনৈতিক প্রতিশোধ বা পুরোনো সমর্থকদের পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই কর্মকর্তারা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সরকারের পক্ষে কাজ করলে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা নির্বাচনের সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
তৃতীয় ঘটনা: নির্বাচন কর্মকর্তাদের পুনর্বহাল
১৮ বছর পর নির্বাচন কমিশন (ইসি) ৮৫ উপজেলা ও থানা নির্বাচন কর্মকর্তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করেছে, যা সোমবার (১৮ আগস্ট) প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঘোষিত হয়। এই কর্মকর্তারা বিএনপি-নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোটের আমলে নিয়োগ পেয়ে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় চাকরি হারান।
তাদের পুনর্বহালে পূর্বের রাজনৈতিক সংযোগের সম্ভাবনা থাকায় নির্বাচনী কেন্দ্রে পক্ষপাতমূলক ভূমিকা গ্রহণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই পদক্ষেপ সরকারের পক্ষে নির্বাচনী ফলাফল নিয়ন্ত্রণে আনার একটি কৌশল হতে পারে।
সমালোচকরা মনে করছেন, এই তিনটি ঘটনা একটি পরিকল্পিত কৌশলের অংশ, যার মাধ্যমে ড. ইউনূসের সরকার নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে দলীয়করণের মাধ্যমে পক্ষপাতদুষ্ট করার চেষ্টা করছে।
বৃহৎ সংখ্যক নিয়োগ, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি এবং পুরোনো নির্বাচন কর্মকর্তাদের পুনর্বহাল একটি এমন কাঠামো গড়ে তুলতে পারে, যেখানে নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা সরকারের নির্দেশে কাজ করতে বাধ্য হবে।
এই প্রক্রিয়ায় শিবির ও ছাত্রদলের সমর্থকদের প্রাধান্য পেলে নির্বাচনী ফলাফল প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। নির্বাচন কমিশন এখনো এই নিয়োগ ও পুনর্বহালের প্রভাব নিয়ে কোনো স্পষ্ট মন্তব্য করেনি, তবে সরকারী উৎস থেকে এটিকে ‘নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ’ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, এই পদক্ষেপগুলো নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও সুষ্ঠতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে জনগণের মধ্যে বিশ্বাসহীনতা বৃদ্ধি পাবে। ফলে, ড. ইউনূসের সরকারের এই কৌশল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী হয়ে উঠতে পারে, যা আগামী নির্বাচনের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
