নিজস্ব প্রতিবেদক। ঢাকা, ১২ আগস্ট ২০২৫:
বাংলাদেশে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্ট মাসের প্রথম ১২ দিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৪ হাজার ছাড়িয়েছে, যা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে। এই সময়ের মধ্যে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ১৯ জনে পৌঁছেছে, যা জুলাই মাসের ৪১ মৃত্যুর তুলনায় কিছুটা কম হলেও সংকটের তীব্রতা প্রকাশ করে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এ পর্যন্ত মোট ২৪,৬১৭ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, এবং মৃত্যুর সংখ্যা ১০৩-এ পৌঁছেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় (১১ আগস্ট সকাল পর্যন্ত) নতুন করে ৪৩৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, এবং একজনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। নতুন আক্রান্তদের মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৯৩, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৩৯, বরিশাল বিভাগে ৬২, চট্টগ্রাম বিভাগে ৬৭, এবং রাজশাহী বিভাগে ৫৩ জন রয়েছেন। বর্তমানে সারাদেশে ১,২৫২ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ প্রফেসর কবিরুল বাশার সতর্ক করে বলেছেন, “ডেঙ্গুর প্রকোপ ইতোমধ্যে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। আগস্টে জুলাইয়ের তুলনায় তিন গুণ বেশি রোগী হতে পারে, এবং সেপ্টেম্বরে এটি শীর্ষে পৌঁছাতে পারে।” তিনি সমন্বিত মশক নিয়ন্ত্রণ এবং কমিউনিটি পরিচ্ছন্নতা অভিযানের উপর জোর দিয়েছেন।
পরিবেশগত ও জলবায়ুগত কারণ:
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া এবং মাঝে মাঝে বৃষ্টির কারণে এডিস মশা, যা ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক, বংশবিস্তারের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ পাচ্ছে। ঢাকা শহর এখনও ডেঙ্গুর প্রধান কেন্দ্র হলেও, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগের গ্রামীণ এলাকাগুলোতে রোগের বিস্তার বাড়ছে, যেখানে চিকিৎসা সুবিধা সীমিত।
চিকিৎসকদের সতর্কতা ও সুপারিশ:
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এইচ এম নাজমুল আহসান জানান, এ বছর ডেঙ্গুর মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার কারণ হলো ‘এক্সপ্যান্ডেড ডেঙ্গু সিনড্রোম’ (ইডিএস), যা লিভার, মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড ও কিডনির মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর ক্ষতি করে। তিনি বলেন, “তীব্র পেটে ব্যথা, বমি, রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে অবিলম্বে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।” তিনি বিশেষ করে বয়স্ক, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার পরামর্শ দেন।[
প্রতিরোধে জনসচেতনতা ও সরকারি পদক্ষেপ:
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জনগণকে মশারি ব্যবহার, মশকনাশক স্প্রে এবং জমে থাকা পানি অপসারণের মাধ্যমে মশার প্রজনন রোধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। বরিশাল ও চট্টগ্রামের মতো উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মশকনাশক স্প্রে এবং পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদার করা হয়েছে। তবে, গ্রামীণ এলাকার স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে সীমিত সুবিধার কারণে গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হচ্ছে। ডা. মুশতাক হোসেন, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, বলেন, “ঢাকায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কাঠামোর অভাব এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সাশ্রয়ী ডেঙ্গু পরীক্ষার সীমিত সুযোগ রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব ঘটাচ্ছে।” তিনি ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও তৃতীয় স্তরের স্বাস্থ্যসেবা পুনর্গঠনের পরামর্শ দেন।
অতীতের তুলনায় পরিস্থিতি:
২০২৩ সাল ছিল বাংলাদেশের ডেঙ্গুর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বছর, যখন ১,৭০৫ জনের মৃত্যু এবং ৩,২১,০০০-এর বেশি আক্রান্ত হয়েছিল। ২০২৪ সালে ৫৭৫ জনের মৃত্যু এবং ১,০১,২১১ জন আক্রান্ত হয়েছিল। চলতি বছরের পরিস্থিতি ২০২৩-এর মতো ভয়াবহ না হলেও, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে রোগের বিস্তার আরও বাড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
আগস্টের প্রথম ১২ দিনে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৪ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে স্বাস্থ্য সংকট তীব্র হয়েছে। পরিবেশবান্ধব মশক নিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করা জরুরি। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন এবং জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, আগামী সপ্তাহগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে, যা প্রতিরোধে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেয়।
