জুলাই পদযাত্রায় ব্যর্থতার পর এনসিপির ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে অনীহা

জুলাই পদযাত্রায় ব্যর্থতার পর এনসিপির ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে অনীহা
শেয়ার করুন
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা, ১২ আগস্ট ২০২৫:

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে স্পষ্ট অনীহা প্রকাশ করেছে। পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন, “ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে না। সে সময় নির্বাচন হলে—যারা শহীদ হয়ে কবরে আছেন, তাদের জীবন ফিরিয়ে দিতে হবে। আর যে ভাইটি হাত হারিয়েছেন, তার হাত ফিরিয়ে দিতে হবে।” তিনি এই বক্তব্যের মাধ্যমে জুলাইয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় প্রাণ হারানো ও আহতদের প্রতি সম্মান প্রকাশ করেন, যা এনসিপির রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করে। মঙ্গলবার (১২ আগস্ট) বিকালে রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে এনসিপির যুব উইং ‘জাতীয় যুবশক্তি’র সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নাসীরুদ্দীন এই মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে নেতাকর্মীরা স্লোগান দিয়ে উৎসাহ প্রকাশ করেন, যা সম্মেলনের উত্তপ্ত পরিবেশের ইঙ্গিত দেয়।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সারাদেশে সহিংসতায় প্রায় ৪০০ জন নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছিল। এই আন্দোলনের ফলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে। এনসিপি এই আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল, কিন্তু তাদের পরিকল্পিত পদযাত্রা ও রাজনৈতিক কার্যক্রম প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জনে ব্যর্থ হয়। এই ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে এনসিপির নেতৃত্ব ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর প্রস্তাবিত নির্বাচনের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করছে।

জুলাই পদযাত্রার আগে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী টেলিভিশনে এক টক শো তে বলেছিলেন, নির্বাচনে এনসিপি ৩০০ সিটে জয়লাভ করবে। অথচ মাত্র একমাসের মাথায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী কথা বদলে যাওয়া নিয়ে হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী তাঁর বক্তব্যে জুলাই আন্দোলনের শহীদদের ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, “আমরা তাড়াহুড়ো করে নির্বাচনে যেতে পারি না। জনগণের ত্যাগের মূল্য দিয়ে অর্জিত এই পরিবর্তনকে আমরা সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।” তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে, নির্বাচনের আগে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যা বর্তমানে সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন। সম্মেলনে উপস্থিত নেতাকর্মীরা তাঁর এই বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়ে স্লোগানে মুখরিত হয়। এনসিপির এই অবস্থান জুলাই আন্দোলনের শহীদদের প্রতি সম্মান প্রকাশ করে, তবে, নির্বাচনে অংশ না নিলে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হতে পারে। অপরদিকে, কেউ কেউ মনে করছেন, এনসিপির এই সিদ্ধান্ত তাদের রাজনৈতিক প্রভাব হ্রাস করতে পারে।

অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণা করেছে, ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর মধ্যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে, এনসিপির মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তির নির্বাচনে অংশগ্রহণে অনীহা সরকারের পরিকল্পনায় জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আলী রিয়াজ বলেন, “এনসিপির এই অবস্থান জুলাই আন্দোলনের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করে, কিন্তু নির্বাচন বর্জন তাদের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা কমিয়ে দিতে পারে।” তিনি আরও বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সংস্কার ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

এনসিপির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা:

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সম্মেলনে জানান, এনসিপি জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের দিকে মনোনিবেশ করবে। তিনি বলেন, “আমরা জনগণের পাশে থাকবো এবং তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করবো।” তবে, তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রকাশ করেননি।

জুলাই পদযাত্রায় ব্যর্থতার পর এনসিপির ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে অংশগ্রহণে অনীহা রাজনৈতিক মাঠে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। মুফতি নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নেতৃত্বে পার্টির এই অবস্থান জুলাই আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করলেও, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় তাদের প্রভাব হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো এনসিপির মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তিকে নির্বাচনে সম্পৃক্ত করা এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করা।

Visited 11 times, 1 visit(s) today