নিজস্ব প্রতিবেদক। ঢাকা, ১১ আগস্ট ২০২৫:
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কাকে ভোট দেবেন, এই প্রশ্নে সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ৪৮.৫০ শতাংশে পৌঁছেছে। গত বছরের অক্টোবরে পরিচালিত একই ধরনের জরিপে এই হার ছিল ৩৮ শতাংশ। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) ও ভয়েস ফর রিফর্মের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘পালস সার্ভে ৩’-এর ফলাফলে এই তথ্য উঠে এসেছে। জরিপে দেখা গেছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট, এবং সংস্কারের অনিশ্চয়তা ভোটারদের সিদ্ধান্তহীনতার প্রধান কারণ। এই ফলাফল দেশের চলমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রতি জনগণের ক্রমবর্ধমান অনাস্থা ও বিভ্রান্তির ইঙ্গিত দেয়।
জরিপের বিস্তারিত ফলাফল
বিআইজিডি ও ভয়েস ফর রিফর্মের এই জরিপটি গত ১ থেকে ২০ জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত টেলিফোনে পরিচালিত হয়, যাতে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ৫,৪৮৯ জন মানুষের মতামত নেওয়া হয়। উত্তরদাতাদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ পুরুষ এবং ৪৭ শতাংশ নারী ছিলেন, যার ৭৩ শতাংশ গ্রামীণ এবং ২৭ শতাংশ শহুরে এলাকা থেকে।
জরিপে রাজনীতি, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, সংস্কার, এবং নির্বাচন-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়।
ভোটের পছন্দ:
বিএনপি: ১২ শতাংশ মানুষ বিএনপিকে ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন, যা গত অক্টোবরে ছিল ১৬.৩০ শতাংশ। অর্থাৎ, বিএনপির সমর্থন কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী: ১০.৪০ শতাংশ মানুষ জামায়াতকে ভোট দেবেন বলে জানিয়েছেন, যা আগের জরিপে ছিল ১১.৩০ শতাংশ।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি): ২.৮০ শতাংশ মানুষ এনসিপিকে সমর্থন করেছেন, যা গত জরিপে ছিল ২ শতাংশ। এটি এনসিপির সমর্থনে সামান্য বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
আওয়ামী লীগ: ৭.৩০ শতাংশ মানুষ আওয়ামী লীগকে (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ভোট দেবেন বলেছেন, যা গত অক্টোবরে ছিল ৮.৯০ শতাংশ।
জাতীয় পার্টি: সমর্থন ০.৭০ শতাংশ থেকে কমে ০.৩০ শতাংশে নেমেছে।
অন্যান্য ইসলামি দল: সমর্থন ২.৬০ শতাংশ থেকে ০.৭০ শতাংশে নেমেছে।
ভোট দেবেন না: ১.৭০ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তারা ভোট দেবেন না।
উত্তর দিতে অনিচ্ছুক: ১৪.৪০ শতাংশ মানুষ কাকে ভোট দেবেন, তা জানাতে চাননি।
জয়ের সম্ভাবনা:
জরিপে প্রশ্ন করা হয়, নির্বাচনী এলাকায় কোন দলের প্রার্থী জিতবে বলে তারা মনে করেন। এতে ৩৮ শতাংশ মানুষ বিএনপির প্রার্থীদের এগিয়ে থাকার কথা বলেছেন, ১৩ শতাংশ জামায়াত, ৭ শতাংশ আওয়ামী লীগ, এবং ১ শতাংশ এনসিপির কথা উল্লেখ করেছেন।
বয়স ও শিক্ষার ভিত্তিতে সমর্থন:
২৭ বছরের নিচে: জামায়াতের প্রতি সমর্থন (১২%) বিএনপির (৯%) চেয়ে বেশি। আওয়ামী লীগ এবং এনসিপির সমর্থন যথাক্রমে ৭% এবং ৪%।
২৮-৩৫ বছর: বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থন সমান (১১%)।
৫০ বছরের বেশি: বিএনপির সমর্থন ১৬%, জামায়াত ৯%, আওয়ামী লীগ ৭%, এবং এনসিপি ৪%।
শিক্ষার স্তর:
গ্রাজুয়েটদের মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থন সমান (১০%), আওয়ামী লীগ ৫%, এবং এনসিপি ৪%। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এমন মানুষের মধ্যে বিএনপির সমর্থন ১৪%, জামায়াত ৯%, আওয়ামী লীগ ৭%, এবং এনসিপি ২%।
নির্বাচনের প্রত্যাশা:
৭০ শতাংশ মানুষ মনে করেন, আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হবে, যখন ১৫ শতাংশ মনে করেন এটি সুষ্ঠু হবে না। নির্বাচনের সময় নিয়ে, ৩২ শতাংশ মানুষ ডিসেম্বর ২০২৫-এর আগে, ১২ শতাংশ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর মধ্যে, ১১ শতাংশ জুন ২০২৬-এর মধ্যে, এবং ২৫ শতাংশ ডিসেম্বর ২০২৬ বা তার পরে নির্বাচন চান।
সংস্কারের দাবি:
৫১ শতাংশ মানুষ পুরোপুরি সংস্কার সম্পন্ন করে নির্বাচন চান, ১৭ শতাংশ জরুরি সংস্কারের পক্ষে, এবং ১৪ শতাংশ সংস্কার ছাড়াই নির্বাচন চান। প্রয়োজনীয় সংস্কার হিসেবে উত্তরদাতারা আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন (৩০%), বিচার ব্যবস্থার উন্নতি (১৬%), নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ (১১%), অর্থনীতি উন্নয়ন (১৬%), দ্রব্যমূল্য হ্রাস (১৩%), বেকারত্ব হ্রাস (১০%), এবং দুর্নীতি দমন (১৭%) উল্লেখ করেছেন।
জনগণের উদ্বেগ:
৮০ শতাংশ মানুষ মব সহিংসতা নিয়ে উদ্বিগ্ন, ৫৬ শতাংশ নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে, এবং ৬৭ শতাংশ পোশাকের জন্য রাস্তায় হয়রানির বিষয়ে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন। দেশের প্রধান সমস্যা হিসেবে ১৫ শতাংশ মানুষ অর্থনীতি ও ব্যবসায় মন্দা, ১৪ শতাংশ আইনশৃঙ্খলার অবনতি, এবং ১৩ শতাংশ রাজনৈতিক অস্থিরতার কথা উল্লেখ করেছেন।
সিদ্ধান্তহীনতার কারণ
জরিপে সিদ্ধান্তহীনতার প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে:
১. রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনাস্থা: গত ৫ আগস্ট ২০২৪-এ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কার্যক্রম নিয়ে জনগণের মধ্যে সন্দেহ ও অনিশ্চয়তা রয়েছে। জরিপে ৪২ শতাংশ মানুষ মনে করেন দেশ রাজনৈতিকভাবে সঠিক পথে আছে, যা গত বছর ছিল ৫৬ শতাংশ। এই হ্রাস রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থার ঘাটতি নির্দেশ করে।
২. অর্থনৈতিক সংকট: ৪৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন দেশ অর্থনৈতিকভাবে সঠিক পথে আছে, যা গত বছর ছিল ৪৩ শতাংশ। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বেকারত্ব, এবং অর্থনৈতিক মন্দা ভোটারদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে, যা তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৩. আইনশৃঙ্খলার অবনতি: আইনশৃঙ্খলার অবনতি (১৪%) এবং মব সহিংসতা নিয়ে ৮০ শতাংশ মানুষের উদ্বেগ সিদ্ধান্তহীনতাকে আরও বাড়িয়েছে। বিশেষ করে, নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ (৫৬%) ভোটারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
৪. সংস্কারের অনিশ্চয়তা: জনগণের ৫১ শতাংশ পুরোপুরি সংস্কারের পর নির্বাচন চান, কিন্তু সংস্কারের গতি ও দিক নিয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব ভোটারদের বিভ্রান্ত করছে। ১৩ শতাংশ মানুষ সংস্কারের বিষয়ে অনিশ্চিত, যা তাদের ভোটের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
৫. রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি হতাশা: বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থন কমেছে, এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় ভোটাররা বিকল্প দলের প্রতি আস্থা স্থাপন করতে পারছেন না। নতুন দল এনসিপির সমর্থন বাড়লেও, এটি এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারেনি।
জরিপে দেখা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কার্যক্রমের প্রতি জনগণের আস্থা কিছুটা কমেছে। ৬৩ শতাংশ মানুষ সরকারকে ভালো নম্বর দিয়েছেন, যা গত অক্টোবরে ছিল ৬৮ শতাংশ। এই হ্রাস সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অস্থিরতা এবং জনমতের প্রতি পর্যাপ্ত সাড়া না দেওয়ার ফল। জনগণ আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি, এবং দুর্নীতি দমনে দ্রুত পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছে।
বিআইজিডির জরিপে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের ভোটাররা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন, যা তাদের ভোটের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। ৪৮.৫০ শতাংশ ভোটারের সিদ্ধান্তহীনতা দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থার সংকট এবং সংস্কারের ধীরগতির প্রতিফলন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিত আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, এবং সংস্কারে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা। নির্বাচনের পূর্বে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ পরিবেশ নিশ্চিত করা না হলে সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে, যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
