অর্থনীতি ডেস্ক
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরের শেষ দিনগুলোতে সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ৯৯,৫৯১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা ৯৯ হাজার কোটি টাকাকে ছাড়িয়ে গেছে। রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার ক্রমশ ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করছে, যদিও দেশের বেশিরভাগ ব্যাংক ইতোমধ্যে তারল্য সংকটে ভুগছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, এই অর্থবছরে সরকার নির্ধারিত ব্যাংকগুলো থেকে ১.২২ লাখ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ২২,৭৬৯ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। ফলে নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৯,৫৯১ কোটি টাকা।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, রাজস্ব সংগ্রহ কমে যাওয়া এবং বেসরকারি বিনিয়োগ হ্রাসের কারণে সরকারি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তারা বলেন, এই অর্থবছরের শুরুতে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে। এ সময় ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকায় ব্যাংকগুলো সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বেশি অর্থ বিনিয়োগ করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এটি দ্বিতীয়বার যখন সরকার এক অর্থবছরে ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে। এর আগে ২০২৩ অর্থবছরে ঋণের লক্ষ্য ছিল ১.১৫ লাখ কোটি টাকা, কিন্তু সরকার ঋণ নিয়েছিল ১.১৯ লাখ কোটি টাকা।
যদিও সরকার বছরের মাঝামাঝি সময়ে বিভিন্ন পণ্য ও পরিষেবার ওপর অতিরিক্ত শুল্ক ও কর আরোপ করেছিল, তবে তা থেকে প্রত্যাশিত রাজস্ব সংগ্রহে ব্যার্থ হয়েছে।
অন্যদিকে, পূর্ববর্তী কিছু অর্থবছরে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণের তুলনায় বেশি পরিশোধ করেছে এবং সঞ্চয়পত্রের মতো অ-ব্যাংকিং উৎসের ওপর বেশি নির্ভর করেছে।

অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “রাজস্ব ঘাটতির কারণে সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিচ্ছে। আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত খুবই কম, এটি উন্নত করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। রাজস্ব লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হলে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রাপ্তি সীমিত হবে, যা ইতোমধ্যে তারল্য সংকটে থাকা ব্যাংকিং খাতের জন্য ক্ষতিকর।”
তিনি কর প্রশাসন জোরদার, করের আওতা বৃদ্ধি এবং অটোমেশন ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দেন।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “সরকারের অতিরিক্ত ঋণ অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক সংকেত। এতে ব্যাংকের তারল্য কমে, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রদানের সুযোগ হ্রাস পায়। এটি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে বাধা সৃষ্টি করে। বর্তমানে বেসরকারি খাতের ঋণের চাহিদা কম হলেও ভবিষ্যতে ব্যাংক ঋণ দিতে না পারলে সুদের হার ও মূল্যস্ফীতি বাড়বে।”
তিনি আরও বলেন, “অনেক ব্যাংক ইতোমধ্যে তারল্য সংকটে ভুগছে, এবং খেলাপি ঋণ মোট ঋণের প্রায় ২৫%। আগামী অর্থবছরে সরকারি ঋণ বাড়লে বেসরকারি খাত আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটি টেকসই সমাধান নয়।”
