কমানোর প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়াল ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা!

কমানোর প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়াল ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা!
শেয়ার করুন

অর্থনীতি

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা রক্ষা করতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। বরং খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে নতুন রেকর্ড গড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যমতে, ২০২৫ সালের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ২০ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ২৪.১৩ শতাংশ— অর্থাৎ প্রতিটি ৪ টাকা ঋণের মধ্যে ১ টাকা আদায় হচ্ছে না।

এটি শুধু গত তিন মাসেই (জানুয়ারি-মার্চ) বেড়েছে প্রায় ৭৪ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা, যা পূর্ববর্তী ডিসেম্বর শেষে ছিল ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিতে বড় পরিবর্তন আসছে। বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতির কোনো ফল দেখা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকেরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ঋণ শ্রেণিকরণের নিয়মে কিছুটা স্বচ্ছতা এলেও, পুনঃতফসিল ও নবায়ন করা অনেক ঋণ আদায় না হওয়ায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। কিছু ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা না থাকলেও, দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়মের মাধ্যমে তা টিকিয়ে রাখা হয়েছিল—এখন তা প্রকাশ পাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫.৭৯ শতাংশ, যা ডিসেম্বর শেষে ছিল ৪২.৮৩ শতাংশ। আর বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে হয়েছে ২০.১৬ শতাংশ, যা আগের ছিল ১৫.৬০ শতাংশ।

সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ বেড়েছে ইসলামী ধারার পাঁচ ব্যাংকে। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের নাম উঠে এসেছে। অনেকেই বলছেন, এসব ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতে ইসলামীর প্রভাবাধীন এবং দলটির নেতাকর্মীদের যোগসাজশে নাবিল গ্রুপসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ বের করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এসব নিয়ে তদন্ত হয়েছিল, এমনকি কিছু নথি ও তথ্য প্রকাশও হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তনের পর এসব উদ্যোগ থেমে যায়। নতুন সরকার—যা নিজেদের অন্তর্বর্তীকালীন বলে দাবি করে—ঋণ সংস্কারের নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও কার্যত খেলাপিদের দাপট বেড়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ইউনূস সরকারের ক্ষমতায় আসার পরই বলা হয়েছিল, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে কাঠামোগত সংস্কার, ঋণ ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা এবং আর্থিক খাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। এমনকি খেলাপি ঋণে বিপর্যস্ত ইসলামী ধারার কয়েকটি ব্যাংককে একীভূত করার ঘোষণাও আসে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, খেলাপিরা আগের চেয়ে আরও বেশি সুবিধা পাচ্ছে, ব্যাংক খাত আরও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকলে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং সাধারণ মানুষের ব্যাংকিং আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, এখন কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বাস্তবায়ন জরুরি—অন্যথায় এই অনিয়ন্ত্রিত খেলাপি সংস্কৃতি অর্থনীতির বড় ধ্বংসযন্ত্র হয়ে উঠবে।

Visited 13 times, 1 visit(s) today