জামায়াত নেতাকে সিলেকশনে সেক্রেটারি না করায় দিরাই প্রেস ক্লাবে নির্বাচন বানচাল বিএনপির

জামায়াত নেতাকে সিলেকশনে সেক্রেটারি না করায় দিরাই প্রেস ক্লাবে নির্বাচন বানচাল বিএনপির
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে সাংবাদিকদের সংগঠন দিরাই প্রেস ক্লাবের নির্বাচন বিএনপি নেতাদের চাপের কারণে স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন।

দিরাই উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর রোকন ইমরান আহমেদকে সেক্রেটারি পদে বিনা ভোটে নির্বাচিত করার দাবিতে নির্বাচন চলাকালে বুধবার দুপুরে দলবদ্ধ হয়ে স্থানীয় বিএনপির একটি গ্রুপ বাধা নির্বাচনে বাধা দেয়। নির্বাচন করলে সাংবাদিকদের দেখে নেওয়া হবে এবং প্রেস ক্লাব দখল করা হবে ঘোষণায় নির্বাচন কমিশন ভয়ে নির্বাচন স্থগিত করে দেয়।

এ ঘটনায় উপজেলার সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

জানা গেছে, প্রেস ক্লাব সভাপতিসহ বেশিরভাগ পদেই বিএনপি নেতাকর্মী সাংবাদিকরা প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন। তবে জামায়াত প্রভাবিত বিএনপির স্থানীয় গ্রুপ নিজেদের সাংবাদিকদের অবজ্ঞা করে জামায়াত নেতার জন্য এই চ্যালেঞ্জ নেওয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয়তাবাদী আদর্শের প্রকৃত নেতাকর্মীরা। এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনায় সাংবাদিকরা ঘৃণা ও নিন্দা জানিয়েছেন।

সংবাদকর্মীরা জানান, বিধি অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠন করে সকল প্রস্তুতি শেষে গতকাল বুধবার দিরাই প্রেস ক্লাবের দ্বিবার্ষিক নির্বাচন ছিল। এ নির্বাচনে সভাপতি পদে প্রতিদ্বদ্বিতা করছিলেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও দৈনিক আমাদের সময়-এর দিরাই উপজেলা প্রতিনিধি সোয়েব হাসান। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদেও বিএনপি ঘরানার বেশিরভাগ সাংবাদিক প্রতিদ্বন্ধী ছিলেন।

এর আগেও গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বারবার নির্বাচনে উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি শামসুল ইসলাম খেজুর নির্বাচিত হয়েছেন। সেই সময়েও নিরপেক্ষভাবে ভোটে প্রেস ক্লাবের নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়েছে এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বা সমমনা কোন সংগঠন কোনও ধরনের প্রভাব বিস্তার করেনি। কিন্তু এবার জামায়াত নেতার জন্য বিএনপির এই চ্যালেঞ্জ নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। নির্বাচন স্থগিতের বিষয়টিকে নজিরবিহীন হিসেবে দেখছেন স্থানীয় সাংবাদিকসহ সুধীজন।

নির্বাচন কমিশন জানায়, গত ২৭শে মে কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে তফসিল ঘোষণা করে এবং নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচনের আয়োজন করে। ভোটের দিন সকালেই নির্বাচন স্থলে উপস্থিত হন জেলা বিএনপির সদস্য আব্দুর রশিদ চৌধুরী, দিরাই পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মিজানুর রহমান মিজান, সদস্য সচিব ইকবাল হোসেন চৌধুরী এবং জামায়াত নেতা মাওলানা লুৎফুর রহমান। তারা নির্বাচন কমিশনে এসে হুমকি-ধমকি দেন। ভোটের বদলে জামায়াত রোকন ইমরান আহমদকে সাধারণ সম্পাদক করার নির্দেশনা দেন।

এতে কমিশন বাধা দিলে নির্বাচন বানচাল করেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। ফলে বাধ্য হয়ে নির্বাচন স্থগিতের ঘোষণা দেয় প্রশাসন।

উল্লেখ্য, ইমরান হোসেন একজন নামধারী সাংবাদিক ও চাঁদাবাজ হিসেবে সর্বমহলে পরিচিত। নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক পদে ভোটারদের পছন্দের প্রার্থী ছিলেন দৈনিক যুগান্তরের উপজেলা প্রতিনিধি জিয়াউর রহমান লিটন। তার বদলে বিএনপি নেতা আব্দুর রশিদ চৌধুরী ও তার লোকজন যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামায়াতের রোকনকে বিনাভোটে সিলেকশনে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণার হুমকি দেন।

নির্বাচন কমিশনার শাহজাহান মাহমুদ হেলাল বলেন, নির্বাচন সম্পূর্ণ নিয়ম মেনে পরিচালিত হচ্ছিল। কিন্তু ভোট শুরুর আগেই কয়েকজন বিএনপি নেতা ভোট কেন্দ্রে এসে একজনকে বিনা ভোটে সেক্রেটারি করার কথা বলেন। এ নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে শান্তি শৃঙ্খলার জন্য আমরা নির্বাচন স্থগিত করে দিয়েছি।

দিরাই প্রেস ক্লাবের সাবেক এক নেতা নামপ্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আওয়ামী লীগ আমলেও আমাদের বিএনপির একাধিক সংবাদকর্মী নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচনে এমন ঘটনা অতীতে কখনো ঘটেনি। কিন্তু আজ বিএনপির কিছু নেতা আমাদের দলের সাংবাদিকদের বদলে যেভাবে জামায়াতের একজনকে সেক্রেটারি করতে নির্বাচন স্থগিত করে দিয়েছেন, তা আমাদের লজ্জা দিয়েছে।

গুপ্তসংগঠন জামায়াত-শিবির প্রতিনিয়ত আমাদের দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় আমাদের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বারবার প্রতিবাদ করছেন। কিন্তু দিরাইয়ের এ ঘটনা আমাদের লজ্জায় ফেলে দিয়েছে, বলেন তিনি।

প্রেস ক্লাব নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার রুদ্র মিজান বলেন, দিরাই প্রেস ক্লাবের নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্যে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলাম। নির্বাচন সরঞ্জামাদি নিয়ে আসি, ব্যালট পেপার মাধ্যমে ভোট গ্রহনের প্রাক্কালে কয়েকজন বিএনপি নেতা এসে নির্বাচন বাধা দেন। তাদের বাধার মুখে নির্বাচন স্থগিত করতে বাধ্য হই। স্বাধীন গণমাধ্যমের বাকস্বাধীনতায় এমন হস্তক্ষেপ কাম্য ছিল না।

উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আমীর হোসেনর এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মঈনুদ্দিন চৌধুরী মাসুক বলেন, সাংবাদিকদের সংগঠন অরাজনৈতিক সংগঠন। তখন আমি দিরাই ছিলাম না। এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না।

পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাইদুল ইসলাম চৌধুরী জানান, প্রেস ক্লাবের নির্বাচনে যারা এই নগ্ন হস্তক্ষেপ করেছে এই দায় তাদের। এর দায়দায়িত্ব বিএনপি কখনো সমর্থন করে না। স্বাধীন গণমাধ্যমের বিশ্বাসী দল বিএনপি।

নির্বাচন বানচালের প্রধান হোতা পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমি এখন থানায় আছি, এ বিষয়ে পরে কথা বলব।’ নির্বাচনে বাধার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি বাধা দেইনি, নির্বাচন স্থগিতের অনুরোধ করে আসছি।’

তবে যুগ্ম আহ্বায়ক ইকবাল হোসেন চৌধুরী ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, কয়েকজন বিএনপির নেতা নিয়ে সেখানে যাই এবং নির্বাচন স্থগিত করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ জানাই।

সিনিয়র সাংবাদিক ইয়াহিয়া চৌধুরী ও সামছুল আলম বলেন, ‘আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ কিন্তু কতিপয় দুর্নীতিবাজরা আমাদের ঐক্য ভাঙতে মরিয়া হয়ে উঠছে।’

বিএনপির সদস্য আব্দুর রশিদ চৌধুরী জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনস্থলে যাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে আমরা বলেছি। আর কিছু করিনি।

Visited 10 times, 1 visit(s) today