গাজীপুরে ৫১টি কারখানা বন্ধ, অনিশ্চয়তায় ৭০ হাজার শ্রমিকের পরিবার

গাজীপুরে ৫১টি কারখানা বন্ধ, অনিশ্চয়তায় ৭০ হাজার শ্রমিকের পরিবার
শেয়ার করুন
অর্থনীতি

শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে গত কয়েক মাসে বিভিন্ন কারণে ৫১টি শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে ৪১টি স্থায়ীভাবে এবং ১০টি অস্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কেয়া গ্রুপের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী মে মাস থেকে তাদের আরও সাতটি কারখানা বন্ধ হবে।

কারখানা বন্ধ হওয়ার ফলে প্রায় ৭০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। যার মধ্যে বেক্সিমকো গ্রুপের ১৬ কারখানাতেই শ্রমিক সংখ্যা ৪২ হাজার। এই শ্রমিকদের পরিবারগুলো চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে।

বকেয়া বেতন পরিশোধ এবং বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর দাবিতে বিক্ষোভে ফেটে পড়ছেন শ্রমিকরা। মহাসড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনাও ঘটেছে। সর্বশেষ, গ্রামীণ টেলিকম ট্রাস্টের মালিকানাধীন গ্রামীণ ফেব্রিক্স অ্যান্ড ফ্যাশন লিমিটেডে অগ্নিসংযোগ করেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। এ অবস্থায় পুরো গাজীপুর যেন বিক্ষোভের নগরীতে পরিণত হয়েছে।

গাজীপুর শিল্পপুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ছোটবড় নিবন্ধিত কারখানার সংখ্যা ২,১৭৬টি। যার মধ্যে তৈরি পোশাক কারখানf ১,১৫৪টি। নভেম্বর মাস থেকে ৩৫টি পোশাক কারখানা কর্মীদের বেতন দিতে পারেনি। ডিসেম্বর থেকে বেতন বকেয়া ৪৫ ভাগ কারখানার। বর্তমানে বিভিন্ন কারণে গাজীপুরের বহু কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ রয়েছে। অনেক কারখানায় বেতন বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) নিয়ে জটিলতা চলমান। স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে ৪১টি কারখানা এবং অস্থায়ীভাবে বন্ধ রয়েছে ১০টি।

বন্ধ কারখানাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের ১৬টি ইউনিট, টঙ্গির টিএমএস অ্যাপারেলস, কোনাবাড়ীর পলিকন লিমিটেড ও অ্যাপারেল প্লাস, কালিয়াকৈরের নায়াগ্রা টেক্সটাইল এবং মাহমুদ জিন্স। এসব কারখানার অধিকাংশই ব্যাংকিং ও আর্থিক জটিলতার কারণে বন্ধ হয়েছে।

ইতিমধ্যে জরুন এলাকায় কেয়া গ্রুপের ছয়টি কারখানা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এসব কারখানায় প্রায় ১৫ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন, যাদের মধ্যে একটা বড় অংশ শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী। ১লা মে থেকে চারটি এবং ২৭শে মে থেকে আরও তিনটি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে বলে জানানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবছর হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করত।

এই শিল্পগ্রুপটির বন্ধ হতে যাওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে- কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডের নিট কম্পোজিট গার্মেন্টস ডিভিশন, নিটিং বিভাগ, স্পিনিং ডিভিশন, কটন ডিভিশন এবং কেয়া ইয়ার্ন মিলস লিমিটেড।

কারখানা বন্ধের নোটিশে কেয়া গ্রুপের মালিকপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমান বাজারের অস্থিতিশীলতা, ব্যাংকের সঙ্গে হিসাবের জটিলতা, কাঁচামালের অভাব এবং উৎপাদন কার্যক্রমে অপ্রতুলতার কারণে তারা এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন। নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয়, শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের পাওনা কারখানা বন্ধের ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে পরিশোধ করা হবে।

কেয়া গ্রুপের মানবসম্পদ বিভাগের ব্যবস্থাপক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, “ব্যাংক হিসাবের জটিলতার কারণে আমাদের রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তবে শ্রমিকদের সব পাওনা পরিশোধ করা হবে।”

এদিকে বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের ১৬টি কারখানাও বন্ধ হওয়ার কারণে ৪২ হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। গত ১৫ই ডিসেম্বর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সভায় এ কারখানাগুলো বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বন্ধের কারণ হিসেবে জানানো হয়েছে, অর্ডার না থাকা এবং ব্যাংক ঋণখেলাপির ফলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

বেক্সিমকোর সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (প্রশাসন) এসএম আব্দুল লতিফ বলেন, “আমাদের ৪২ হাজার শ্রমিকের জীবিকা হুমকির মুখে। আমরা লে-অফ তুলে নিয়ে সরকারের সহযোগিতা চাই। প্রধান উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্ট সবার কাছে অনুরোধ করছি, ব্যাক টু ব্যাক এলসি এবং অন্যান্য ব্যাংকিং সুবিধা চালু করে কারখানা পুনরায় সচল করার ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”

বকেয়া বেতন ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধের দাবিতে গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর এলাকার ডার্ড কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেড কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেছেন। দুই শতাধিক শ্রমিক সাত মাস ধরে বেতনসহ প্রভিডেন্ট ফান্ড, সার্ভিস বেনিফিট এবং প্রসূতিকালীন ভাতা পাননি। মালিকপক্ষ বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও কোনও সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ শ্রমিকদের।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের গাজীপুর মহানগর সভাপতি শফিউল আলম বলেন, “বন্ধ হয়ে যাওয়া ডার্ড কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেডের শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধে সরকার মালিককে সুদমুক্ত ১৩ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। কিন্তু এক মাস পার হলেও এখনও সব শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ করা হয়নি। ইতোমধ্যে ৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা পরিশোধ করা হলেও আরও ১৪ কোটির বেশি টাকা বকেয়া রয়েছে।”

ডার্ড গ্রুপের চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার ফয়েজ আহমেদ বলেন, “আমরা শ্রমিকদের কিছু বকেয়া পরিশোধ করেছি। একসঙ্গে সব টাকা দেওয়া সম্ভব নয়, তবে বাকি টাকা অবশ্যই পরিশোধ করা হবে।”

তিনি আরও বলেন, ‘৫ই আগস্টের পর গাজীপুরের বেশ কিছু কারখানা বকেয়া বেতনের কারণে বন্ধ হয়েছে। কিছু কারখানার মালিক আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তারা নানা কারণে অনুপস্থিত থাকায় কারখানাগুলো বন্ধ হয়েছে। এসব কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। এখনও অনেকগুলো কারখানায় শ্রম অসন্তোষ রয়েছে। শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল, তা নেওয়া হয়নি। যেকোনও অসন্তোষ নিরসনে সরকারের উচিত শ্রমিকদের সড়ক থেকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসা। আলোচনার মাধ্যমে ন্যায়সঙ্গত সমাধানে শ্রমিকদের পাশে থাকা।’

শিল্প পুলিশ-২-এর পুলিশ সুপার একেএম জহিরুল ইসলাম জানান, জেলার ৫১টি শিল্প কারখানা বন্ধ রয়েছে, যার মধ্যে ১০টি অস্থায়ীভাবে। ব্যাংকিং সমস্যা ও মালিকদের অনুপস্থিতিসহ নানা কারণে এই কারখানাগুলো বন্ধ হয়েছে।

শ্রমিক অসন্তোষ মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা সড়ক-মহাসড়কে নেমে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।

Visited 114 times, 1 visit(s) today