সংবাদ প্রতিবেদন
বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমল। ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পর থেকে সারাদেশে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বেছে বেছে নিধন-নিপীড়ন চলছে। আওয়ামী লীগের দলীয় দাবি, এ সময় ২১ হাজারের বেশি নেতা-কর্মীকে হত্যা করেছে ক্ষমতাসীন সররকারদলীয় লোকজন।
সেসময়, ২০০৩ সালের ৫ই নভেম্বর রাতে যশোরের অভয়নগর উপজেলার আওয়ামীপন্থী শ্রমিক সংগঠনের নেতা ইব্রাহীম হোসেন সরদার (৫২) নওয়াপাড়া বাজার থেকে বন্ধুর সঙ্গে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন। নওয়াপাড়া রেলস্টেশনের সামনে রেললাইন পার হওয়ার সময় বিএনপির সন্ত্রাসীরা অতর্কিতে তাকে গুলি করে হত্যা করে। ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। ইব্রাহীম তখন যশোর জুট ইন্ডাস্ট্রিজ (জেজেআই) শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি এবং নওয়াপাড়া পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন।
তার মৃত্যুর ২১ বছর ১ মাস ২২ দিন পর তার বড় ছেলে আওয়ামী লীগ নেতা জিয়াউদ্দিন পলাশও (৪৫) একইভাবে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। শনিবার সন্ধ্যায় বাড়ির কাছের একটি চায়ের দোকান থেকে তাকে অপহরণ করে বিএনপির নেতা-কর্মীরা। পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে রাতে নওয়াপাড়া বুড়িরঘাট এলাকায় আয়কর অফিসের পেছনে ফেলে রেখে যায়। স্থানীয়রা রাত সোয়া ১০টার দিকে তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পলাশও তার বাবার মতো যশোর জুট ইন্ডাস্ট্রিজ (জেজেআই) শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সম্পাদক ছিলেন। ২০২০ সালের ২রা জুলাই পাটকলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তিনি বেকার হয়ে পড়েন। তিনি নওয়াপাড়া পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ওই ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ছিলেন।
পলাশের হত্যার ঘটনায় এলাকাবাসী রইচ সিকদার (৩৫) নামে এক বিএনপি নেতাকে ধরে পিটুনি দিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে। রইচ সিকদার নওয়াপাড়া গ্রামের সিদ্দিক সরদারের ছেলে। তিনি নওয়াপাড়া পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ড বিএনপির প্রচার সম্পাদক এবং পৌর যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য।
পড়ুন: অপহরণের পর আওয়ামী লীগ নেতাকে কুপিয়ে হত্যা, বিএনপি নেতাকে গণপিটুনি
নওয়াপাড়া গ্রামে পলাশের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, আড়ম্বরহীন একতলা ভবনের সামনে ভিড় জমিয়েছেন শতাধিক নারী-পুরুষ। বাড়ির সামনের উঠোনে বসে ছিলেন পলাশের ছোট ভাই আব্দুল মান্নান ওরফে লেনিন (৪০), শোকে বিহ্বল হয়ে বলছিলেন, “আমরা সাদাসিধে জীবন-যাপন করি। কারও কোনো ক্ষতি করি না। চাঁদার জন্যই আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। আমার বাবাকেও একইভাবে মেরে ফেলেছিল বিএনপির লোকজন। আমরা কার কাছে বিচার চাইব?”
ঘরের ভেতরে ছেলের জন্য বিলাপ করছিলেন মা ফরিদা বেগম (৬৫)। শোকে তিনি বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। তাকে ঘিরে কয়েকজন নারী নানাভাবে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। পলাশের মৃত্যুর খবরে তার স্ত্রী শারমিন নাহার (৩৫) বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। দুই শিশু সন্তান— তাসিন সরদার (১০) ও তাইফ সরদার (৯ মাস)— মায়ের পাশে চুপচাপ। চারদিকের পরিস্থিতি তারা অনুধাবন করতে না পেরে ভীত-সন্তস্ত্র হয়ে রয়েছে। পুরো পরিবার শোকে স্তব্ধ।
পরিবারের সদস্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে পলাশ তেঁতুলতলা মসজিদের পাশে একটি চায়ের দোকানে বসে চা পান করছিলেন। এ সময় বিএনপি নেতা রইচ সিকদারের নেতৃত্বে ১০-১২ জনের একটি দল তাকে চায়ের দোকান থেকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যায়। প্রায় ১০ মিনিট পর, সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে দুই ব্যক্তি পলাশের বাড়িতে গিয়ে নিজেদের নাম জিহাদ ও সাগর বলে পরিচয় দেন।
তারা নিজেদের মোবাইল থেকে পলাশের স্ত্রী শারমিন নাহারের সঙ্গে তার কথা বলান। ফোনে পলাশ জানান, “আমি মার্ডারের পরিস্থিতিতে আছি। ওদের ২০ হাজার টাকা দাও।” টাকা নিয়ে চলে যাওয়ার পর পলাশকে নওয়াপাড়া বুড়িরঘাট এলাকায় আয়কর অফিসের পেছনে ভৈরব নদের তীরে বালুর স্তূপে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে এবং পিটিয়ে ফেলে রেখে যাওয়া হয়।
পরে এলাকাবাসী তাকে রক্তাক্ত ও অচেতন অবস্থায় খুঁজে পেয়ে রাত সোয়া ১০টার দিকে উদ্ধার করে অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর পালানোর চেষ্টা করার সময় স্থানীয়রা রইচ সিকদারকে আটক করে গণপিটুনি দেয় এবং পরে তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে।
অভয়নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. এমাদুল করিম জানান, পলাশকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িত একজনকে আটক করা হয়েছে। মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মর্গ থেকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডের কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ নিয়ে একটি মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

