❐ নিজস্ব প্রতিবেদক
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম যখন নিম্নমুখী, ঠিক সেই সময়েই দেশে লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে স্বস্তির আভাস মিললেও দেশের ভোক্তাদের জন্য এলো উল্টো চাপ।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শিগগিরই প্রশমিত হতে পারে—এমন আশাবাদে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমেছে।
ব্রেন্ট ক্রুড তেলের ফিউচার্স ১ শতাংশের বেশি কমে প্রতি ব্যারেল ৯৮.০৫ ডলারে নেমে এসেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দামও কমে ৯৪ ডলারের নিচে নেমেছে।
এর আগে মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার কারণে তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তা আবার ১০০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে এবং সপ্তাহজুড়ে ৯০ ডলারের ঘরেই অবস্থান করছিল।
এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বস্তির ইঙ্গিত থাকলেও দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, নতুন দাম রবিবার থেকে কার্যকর হয়েছে।
নতুন দরে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা এবং পেট্রল ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকায় উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিটি ক্ষেত্রেই ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখতেই এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠছে—যখন বিশ্ববাজারে দাম কমছে, তখন সেই “সামঞ্জস্য” ঠিক কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে?
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি মূল্য নির্ধারণে সময়োপযোগী ও স্বচ্ছ পদ্ধতির অভাব এই ধরনের বৈপরীত্য তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য কমার প্রতিফলন যদি দ্রুত দেশে না আসে, তাহলে ভোক্তারা এক ধরনের একমুখী চাপের মুখে পড়ে—দাম বাড়লে তা দ্রুত কার্যকর হয়, কিন্তু কমলে তার সুবিধা পৌঁছাতে দেরি হয়।
এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বহুমাত্রিক। পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ফলে পণ্য পরিবহনে খরচ বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে প্রতিফলিত হবে। কৃষিখাতে সেচ ও উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, ফলে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এমনিতেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য এটি নতুন করে উদ্বেগের কারণ। জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
নীতিনির্ধারকদের জন্য এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়—জ্বালানি মূল্য নির্ধারণে কি কোনো দীর্ঘমেয়াদি কৌশল রয়েছে, নাকি তা তাৎক্ষণিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে? বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিকল্প জ্বালানি উৎসের উন্নয়ন, দক্ষ সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ কাঠামো গড়ে তোলা না গেলে ভবিষ্যতে এমন চাপ আরও ঘন ঘন দেখা দিতে পারে।
সব মিলিয়ে, বিশ্ববাজারে দামের পতন সত্ত্বেও দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি একটি নীতিগত বৈপরীত্য হিসেবে সামনে এসেছে—যার সরাসরি প্রভাব পড়বে অর্থনীতি, বাজার এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।
