❐ বিডি ডাইজেস্ট ডেস্ক
বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) ডিজিটাল সম্প্রচার শিখতে ও যন্ত্রপাতি দেখতে ঠিকাদারের অর্থে ইংল্যান্ড, বেলজিয়াম এবং জার্মানি যাচ্ছেন ২১ কর্মকর্তা। ইতোমধ্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে তাদের নামে জিও (সরকারি আদেশ) জারি করা হয়েছে।
৪ থেকে ১৭ই এপ্রিল পর্যন্ত ১৩ কর্মকর্তার জার্মানি ও বেলজিয়ামে ‘ফ্যাক্টরি ট্রেনিং’ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে জিওতে।
৩২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে বিটিভির জন্য ডিজিটাল ট্রান্সমিটারসহ আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি পছন্দ করতে (প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশনে) ৮ কর্মকর্তা যাবেন ২৫শে এপ্রিল। এ বিষয়ে জারি করা হয়েছে পৃথক আরেকটি জিও।
‘বাংলাদেশ টেলিভিশনের দেশব্যাপী ডিজিটাল টেরিস্ট্রিয়াল সম্প্রচার প্রবর্তন (প্রথম পর্যায়) প্রকল্পের আওতায় তাদের এ ভ্রমণ। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং বিটিভি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এবং অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ইয়াসিন কর্মকর্তাদের ‘ফ্যাক্টরি ট্রেনিং’ অনুষ্ঠান উদ্বোধন ও পর্যবেক্ষণ করতে ৪ থেকে ১৭ই এপ্রিল পর্যন্ত জার্মানি ও ইংল্যান্ড ভ্রমণ করবেন উল্লেখ করে পৃথক জিও জারি করা হয়।
তবে যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় এ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী যাবেন না বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমার প্রোগ্রাম সূচিতে এমন কোনো কর্মসূচি নেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিটিভির প্রকৌশলী পর্যায়ের কেউ সফরে অন্তর্ভুক্ত হননি, উপসহকারী প্রকৌশলী পর্যায় থেকে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। পিএসআইতে (প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন) যাওয়া ৮ কর্মকর্তার মধ্যে পাঁচজনই বিটিভির বাইরের। তারা অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে প্রেষণে সাময়িকভাবে বিটিভিতে কর্মরত।
১৮ জুলাই বিটিভি ভবনে আগুন-ভাঙচুর-সহিংসতা ও দখলের দায় স্বীকার আন্দোলনকারীর
মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার আশীর্বাদে তারা অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
বিটিভি থেকে যে তালিকা প্রস্তাব করা হয়েছিল, তাতে কাটছাঁট করে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তারাও ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিশেষ ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। অনেকে ঠিকাদারের পক্ষ থেকে ‘প্লেজার ট্রিপ’ হিসেবে দেখছেন এটিকে। এতে স্বার্থের সংঘাত বা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের, সে প্রশ্নও সামনে আসছে।
বিটিভির উন্নয়নে ২০১৮ সালে শেখ হাসিনার সরকারের সময় গৃহীত হয় ২৬০ কোটি টাকার প্রকল্প। বিদেশ থেকে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হয়। যার সুফল ভোগ করেছিল দেশের মানুষ। সম্প্রচারের মানও উন্নত হয়েছিল।
কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে সংঘটিত দাঙ্গা-সন্ত্রাসের বলি হয় বিটিভি ভবন। আন্দোলনকারীরা বিটিভি ভবন দখল করতে গিয়ে তাতে ভাঙচুর করে, অগ্নিসংযোগ ঘটায়। বিটিভি ভবনের হাজার হাজার কোটি টাকার যন্ত্রপাতি বিনষ্ট করা হয়। গাড়ি, আসবাব, ক্যামেরা, ব্রডকাস্টিং সরঞ্জামসহ বিপুল ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয় বিটিভি।
যার প্রেক্ষিতে ড. ইউনূসের আমলে যন্ত্রপাতি পুনঃ সংগ্রহে ৩২৯ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। কিন্তু সেসময় এই ক্রয় নিয়ে আর্থিক অনিয়মের খবর পায় গণমাধ্যম। ব্যাপক সমালোচনার পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্রয় প্রক্রিয়া স্থগিত করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দুই পর্বে ২১ জনের সফরের পুরো ব্যয়ভার বহন করবে বাংলাদেশ টেলিভিশনের দেশব্যাপী ডিজিটাল টেরিস্ট্রিয়াল সম্প্রচার প্রবর্তন (প্রথম পর্যায়) প্রকল্পের জন্য যন্ত্রপাতি প্রদানকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। যদিও জিওতে বলা হয়েছে, আমন্ত্রণকারী সংস্থা যাওয়া-আসাসহ সব ধরনের ব্যয়ভার বহন করবে।
‘বাংলাদেশ টেলিভিশনের দেশব্যাপী ডিজিটাল টেরিস্ট্রিয়াল সম্প্রচার প্রবর্তন’ প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল ২০১৮ সালের জুলাইয়ে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা ছিল। প্রকল্প প্রস্তাবনায় সারা দেশের বিটিভির রিলে স্টেশনগুলো ডিজিটালাইজ করা ও অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল সম্প্রচারে রূপান্তর এবং ক্রিস্টাল ক্লিয়ার পিকচার ও সাউন্ড সিস্টেম নিশ্চিতের কথা বলা হয়। এ প্রকল্পের অধীন বিভিন্ন পদে ২৫ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
বর্তমান বিএনপি সরকারের সময় মন্ত্রণালয়ের জিওতে বলা হয়েছে, বিটিভির যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ‘ফ্যাক্টরি ভিজিট’ করতে দুই সপ্তাহের জন্য জার্মানি ও ইংল্যান্ড যাচ্ছেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীসহ সরকারের ২২ কর্মকর্তা।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব তাসলিমা নুর হোসেনের স্বাক্ষরে ২৫শে মার্চ জারি করা জিওতে বলা হয়েছে, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মাদ ইয়াসিন ৪ থেকে ১৭ই এপ্রিল পর্যন্ত জার্মানির মিউনিখ ও ইংল্যান্ডে ফ্যাক্টরি ট্রেনিং’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান পর্যবেক্ষণ করবেন। তাদের এ ভ্রমণের সব ধরনের ব্যয়ভার সংস্থাটি বহন করবে।
এর আগের দিন ২৪শে মার্চ তথ্য মন্ত্রণালয়ের একই কর্মকর্তার স্বাক্ষরে জারি করা অপর জিওতে বলা হয়, বেলজিয়ামের ব্রাসেলস এবং জার্মানির মিউনিখে অনুষ্ঠেয় ৪ থেকে ১৭ই এপ্রিল পর্যন্ত মোট ১৪ দিন ফ্যাক্টরি ট্রেনিংয়ে অংশ নেবেন।
এই আদেশে উল্লিখিত ১২ কর্মকর্তা হলেন—তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মাহফুজা আক্তার, যুগ্ম সচিব (বিটিভি) মোহাম্মদ রোকন উদ্দিন, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব সোলেমান আলী, বিটিভির প্রকল্প পরিচালক মাহমুদুর রহমান, বিটিভির আট উপসহকারী প্রকৌশলী হুমায়ুন কবীর, বিষু চন্দ্র দাস, মোস্তাফিজুর রহমান, মাজেদুল হক, শরিফুল আলম, শান্তনু বড়ুয়া, অনিমেষ দেবনাথ এবং মোহাম্মদ আতাউর রহমান।
গত ৩০শে মার্চ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব তাসলিমা নুর হোসেনের স্বাক্ষরে জারি করা জিওতে বলা হয়েছে, বেলজিয়ামের ব্রাসেলস ও জার্মানির মিউনিখ থেকে বিটিভির স্টুডিও যন্ত্রপাতি আমদানির বিষয়ে ‘ফ্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন’-এর আওতায় ২৫শে এপ্রিল থেকে ১লা মে পর্যন্ত বেলজিয়াম ও জার্মানি ভ্রমণ করবেন আট কর্মকর্তা।
তারা হলেন—তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব রিয়াসত আলী ওয়াসিফ, উপসচিব তাসলিমা নুর হোসাইন, বিটিভির পরিচালক সোনিয়া বিনতে তাবিব, প্রকল্প পরিচালক মাহমুদুর রহমান, বিটিভির রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী নুসরাত জাবিন ও মোরশেদা আক্তার, প্রকৌশলী (গ্রেড-১) সৈয়দ জোবায়েদ বিন লতিফ এবং উপসহকারী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম। সবার যাওয়া-আসাসহ ভ্রমণকালীন সব ব্যয় প্রজেক্টের অধীনে সংস্থাটি বহন করবে।
সরকারের বক্তব্য
বিটিভি ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের জার্মানি, ইংল্যান্ড ও বেলজিয়াম সফরের বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমাকে বলা হয়েছে এ সফরের বিষয়ে সরকারের কোনো আর্থিক সংশ্লিষ্টতা নেই। এ সফরে কিছু কর্মকর্তা অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন।’
এটি বিবেচনায় নিয়েই ভ্রমণের অনুমতিসংক্রান্ত ফাইল অনুমোদন করা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
প্রকল্প পরিচালক হামিদুর রহমানও প্রশিক্ষণ নিতে কর্মকর্তাদের সঙ্গে বেলজিয়াম ও জার্মানি যাচ্ছেন। এ বিষয়ে তার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হয়। প্রসঙ্গটি তুলতেই তিনি ফোনের লাইন কেটে দেন। এরপর ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি।


