জাতিসংঘের চিঠির জবাব দিতে পারেননি ইউনুস

জাতিসংঘের চিঠির জবাব দিতে পারেননি ইউনুস
শেয়ার করুন

আমিনুল হক পলাশ

২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের তিনজন মানবাধিকার বিষয়ক উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠান। চিঠিটি কোন সাধারণ কূটনৈতিক যোগাযোগ ছিলো না। সেই চিঠিতে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা, দলটির বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংক্রান্ত আইনি কাঠামোর অপ-ব্যবহার, রাজনৈতিক বক্তব্য ও সমাবেশের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ, দলটির সদস্যদের বিনা বিচারে গ্রেপ্তার এবং যথাযথ আইনী সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ জানানো হয়।

চিঠিতে স্বাক্ষর করেছিলেন সন্ত্রাস দমনের প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা রক্ষা বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি বেন সল, ওয়ার্কিং গ্রুপ অন আরবিট্রারি ডিটেনশনের যোগাযোগ বিষয়ক ভাইস-চেয়ার ম্যাথিউ জিলেট এবং বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাধীনতা বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি মার্গারেট স্যাটারথওয়েট। তাঁদের ভাষা ছিল খুবই সুস্পষ্ট। তাঁরা বলেন, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপগুলো সংগঠনের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, মতপ্রকাশ, স্বাভাবিক জীবন যাপন এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারের উপর ‘অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত’ বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের ভাষায় এটি সামান্য মন্তব্য নয়। এটি ছিল এক প্রকার সতর্কবার্তা।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চিঠিতে স্পষ্ট বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ সরকারের জবাব ৬০ দিনের মধ্যে প্রকাশ করা হবে। কিন্তু ডঃ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এই চিঠির কোন জবাব দেয়নি। এই নীরবতাই এখন ঘটনাটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক দিক। নীরবতা মানেই আইনি স্বীকারোক্তি নয়, কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নীরবতা কখনোই অর্থহীন নয়। যখন একটি সরকারকে নাগরিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে জাতিসংঘ সরাসরি জবাবদিহির মুখে দাঁড় করায়, তখন জবাব না দেওয়ার অর্থ হলো প্রকারান্তে বিষয়টি স্বীকার করে নেয়। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, সরকার যদি সত্যিই বিশ্বাস করে যে তার পদক্ষেপ আইনসম্মত, প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সঙ্গত ছিল, তবে সে কথা কেন তারা জাতিসংঘকে জানাতে পারলো না?

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা কোনো অস্পষ্ট মন্তব্য করেননি। তাঁরা একের পর এক নির্দিষ্ট প্রশ্ন তুলেছেন। আওয়ামী লীগের ওপর দলগত নিষেধাজ্ঞা আরোপের পেছনে কী ধরনের ‘বর্তমান ও সুনির্দিষ্ট ঝুঁকি’ ছিল? এই নিষেধাজ্ঞা কীভাবে প্রয়োজনীয়, সামঞ্জস্যপূর্ণ ও বৈষম্যহীন বলে গণ্য হতে পারে? এটি কত দিন বহাল থাকবে? এর পর্যালোচনার সুযোগ আছে কি? দলটিকে কি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল? সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করার কার্যকর প্রতিকার কী? আর নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক বহুত্ববাদ অক্ষুণ্ন রাখতে সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে?

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১২ মে শেখ হাসিনা ও অন্য নেতাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্য শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, জনসভা, প্রকাশনা, গণমাধ্যমে প্রচার এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ। নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধনও বাতিল করে। অর্থাৎ দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিকে কার্যত নির্বাচন ও জনজীবন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

এখানেই জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক বিপদের ইঙ্গিত দিয়েছেন। একটি পদক্ষেপকে ‘সাময়িক’ বলা হলেও, যদি তা নির্বাচনী সময়জুড়ে বহাল থাকে, তবে বাস্তবে তার ফল দাঁড়ায় দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অপসারণ। এতে শুধু একটি দলই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, ভোটারদের একটি বড় অংশও কার্যত প্রতিনিধিত্বহীন হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক বহুত্ববাদ তখন শুধু দুর্বল হয় না, বরং কাঠামোগতভাবে সংকুচিত হয়ে যায়।

চিঠিতে রাজনৈতিক মতপ্রকাশের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে বাধা দেওয়া হয়েছে বলে তাদের নিকট সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে। এমনকি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সত্তার পক্ষে ‘যেকোনো প্রচার’ও সংশোধিত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় নিষিদ্ধ হতে পারে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞগণ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এ ধরনের বিস্তৃত বিধিনিষেধ সহিংসতায় উসকানি রোধের সীমা ছাড়িয়ে রাজনৈতিক মত, বিরোধী কণ্ঠ ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চাকেই স্তব্ধ করে দিতে পারে।

শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ক্ষেত্রেও তাঁদের অবস্থান ছিল স্পষ্ট। একটি বড় রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে blanket restriction বা সামগ্রিক নিষেধাজ্ঞা সাধারণ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়; এটি ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ, যার জন্য ব্যতিক্রমী মাত্রার সুনির্দিষ্ট যুক্তি প্রয়োজন। জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপকে তাঁরা নীতিগতভাবেই অপপ্রয়োজনী ও মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ হিসেবে দেখেছেন।

চিঠিতে জুলাই আন্দোলন পরবর্তী সময়ে আওয়ামীলীগ নেতা কর্মী ও সমর্থকদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার, হেফাজতে মৃত্যু, নির্যাতনের আলামত এবং ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পালাবদলের পর সহিংসতার ঘটনায় দায়ীদের blanket immunity বা সামগ্রিক দায়মুক্তির অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে মনে করা হয় এমন বহু মানুষকে, এমনকি সাংবাদিক ও আইনজীবীদেরও গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগকে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা গভীরভাবে উদ্বেগজনক বলেছেন। একই সঙ্গে তাঁরা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, এ ধরনের দায়মুক্তি আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে চলা মামলার প্রসঙ্গেও তারা তীব্র উদ্বেগ জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা সুনির্দিষ্টভাবে বিচার প্রক্রিয়ার ন্যায্যতা নিয়ে ‘গুরুতর উদ্বেগ’ এর কথা বলেছেন। পছন্দের আইনজীবী পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া, আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য পর্যাপ্ত সময় না পাওয়া, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দ্রুত পুনর্বিন্যাস এবং বিচারকে ঘিরে উচ্চমাত্রার রাজনৈতিক পরিবেশ; সব কিছু নিয়েই তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের সতর্কবার্তা ছিল স্পষ্ট, ন্যায্য বিচার নিশ্চিত না হলে যেকোনো মৃত্যুদণ্ড আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে স্বেচ্ছাচারী ও অগ্রহণযোগ্য হয়ে পড়ে।

এটি কোনো সাধারণ প্রক্রিয়াগত আপত্তি নয়। এটি বিচারপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। তখন প্রশ্নটি বিচার হচ্ছে কি না তে সীমাবদ্ধ থাকে না; প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, বিচার কি ন্যায়বিচারের স্বার্থে হচ্ছে, নাকি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে।

একটি সরকার যদি নিজের পদক্ষেপের বৈধতা ও ন্যায়সংগততা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়, তাহলে তার স্বাভাবিক পথ হলো জবাব দেওয়া। আইনি যুক্তি তুলে ধরা, প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার কথা বলা, আপিলের সুযোগ ব্যাখ্যা করা। কিন্তু ডঃ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সেটি করতে ব্যর্থ হয়েছে। আর এই ব্যার্থতাই আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে তাদের অবস্থানকে বিতর্কিত করেছে।

বিষয়টি কেবলমাত্র আওয়ামীলীগের সাথে সম্পর্কিত নয়। বিষয়টি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের সাথেও জড়িত। একটি অনির্বাচিত সরকার যদি আওয়ামী লীগের মতো একটি বড় রাজনৈতিক শক্তিকে নিষিদ্ধ করতে পারে, তার মতপ্রকাশের অধিকার রোধ করতে পারে, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথ বন্ধ করতে পারে, এবং তারপরও জাতিসংঘের বিস্তারিত প্রশ্নের জবাব না দেয়, তাহলে সেটি আর নিছক দলীয় বিরোধের প্রশ্ন থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে সংবিধান, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নীরবতাকে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি হিসেবে দেখা হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেটি বিশ্বাসযোগ্য জবাবের অনুপস্থিতি হিসেবে ধরে নেয়া হয়। জাতিসংঘের এই চিঠির পর অন্তর্বর্তী সরকারের নীরবতা তাই কোন স্বাভাবিক বিষয় নয়; বরং এটি ডঃ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে উঠা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগকে মেনে নেয়ারই সামিল।

শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় সম্ভবত চিঠির ভাষা নয়, বরং চিঠির পরের নীরবতা। কারণ, যখন একটি সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বহুত্ববাদ সংকুচিত করা, আইনের অপপ্রয়োগ করা এবং বিরোধী কণ্ঠ রুদ্ধ করার অভিযোগ ওঠে, তখন নীরবতা সংকট কমায় না; বরং তাকে আরও গভীর করে।

 

Visited 277 times, 1 visit(s) today