চলছে হাজার কোটির খেলা: নির্বাচনের বাকি ৩ দিন, এর মাঝেই ইউনূস সরকারের বিপুল কেনাকাটা-চুক্তির হিড়িক

চলছে হাজার কোটির খেলা: নির্বাচনের বাকি ৩ দিন, এর মাঝেই ইউনূস সরকারের বিপুল কেনাকাটা-চুক্তির হিড়িক
শেয়ার করুন

 

❐ বিডি ডাইজেস্ট ডেস্ক


জাতীয় নির্বাচনের আর মাত্র তিন দিন বাকি। এরই মধ্যে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে বিদায়ের প্রস্তুতির আভাস। উপদেষ্টারা দায়িত্ব ছাড়ার প্রস্তুতিতে থাকলেও এই বিদায়ী মুহূর্তে ইউনূস সরকারের বিপুল অঙ্কের কেনাকাটার মহোৎসব চলছে, আন্তর্জাতিক চুক্তি ও ব্যয়বহুল প্রকল্প অনুমোদনের তৎপরতা বেড়েছে—যা নতুন করে প্রশ্ন ও বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে।

নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর সাধারণত ক্ষমতাসীন সরকারের কার্যক্রম সীমিত থাকে দৈনন্দিন রুটিন কাজ ও নির্বাচন পরিচালনায়। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এর বিপরীত চিত্র।

শেষ সময়ে একের পর এক বড় চুক্তি ও মেগা প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে, যা সাধারণত রাজনৈতিক সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ারভুক্ত। চীন ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে নৌযান ক্রয় চুক্তি, ৩৭ হাজার কোটি টাকায় বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্টের আওতায় বাণিজ্যচুক্তি—সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুতগতিতে একাধিক দীর্ঘমেয়াদি দায় সৃষ্টি করছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রস্তাবিত নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের চাপ, বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও খেলাপি ঋণের বোঝা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই দায়ভার নিয়েই নতুন সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে, যা শুরুতেই তাকে কঠিন এক অগ্নিপরীক্ষার মুখে ফেলবে।

তফসিলের পরও প্রকল্প অনুমোদনের হিড়িক

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরবর্তী মাত্র ২৫ দিনে (১লা ডিসেম্বর থেকে ২৫শে জানুয়ারি) অন্তর্বর্তী সরকার ৬৪টি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে, যার মোট ব্যয় ১ লাখ ৬ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪০টি প্রকল্পই সম্পূর্ণ নতুন, ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৯ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা।

দেড় বছরের মেয়াদে সরকার মোট ১৩৫টি নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যার সম্মিলিত ব্যয় ২ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। অতীতে রাজনৈতিক সরকারের আমলে তফসিল ঘোষণার পর একনেক সভা স্থগিত থাকলেও, এবার তার ব্যতিক্রম ঘটেছে। এক সপ্তাহেই একাধিক মেগা প্রকল্প অনুমোদনের ঘটনায় প্রশাসনিক রীতিনীতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্লেষকদের অভিযোগ, শেষ মুহূর্তে অনুমোদিত কিছু প্রকল্প নির্দিষ্ট এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। যদিও সরকার পক্ষের দাবি, এসব প্রকল্প দেশের উন্নয়নের স্বার্থেই জরুরি।

অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারণ বিশ্লেষকরা অন্তর্বর্তী সরকারের এই তৎপরতাকে অপ্রয়োজনীয় ও সময়োচিত নয় বলে মনে করছেন।

সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, দীর্ঘমেয়াদি ও অজরুরি চুক্তি অন্তর্বর্তী সরকারের করা উচিত ছিল না।

তার মতে, বড় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনাও হয়নি, যা নির্বাচিত সরকারের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্র সংকুচিত করছে।

যেসব চুক্তি ঘিরে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি
ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য এই চুক্তির আওতায় পোশাক রপ্তানিতে শুল্কছাড়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে আগে স্বাক্ষরিত নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্টের কারণে চুক্তির শর্ত গোপন রাখা হয়েছে, যা স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই চুক্তির বিনিময়ে বাংলাদেশ বোয়িং উড়োজাহাজসহ গম, তুলা ও এলএনজি আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাঁচ বছরে ৩৫ লাখ টন গম আমদানির চুক্তিও এর অংশ।

বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয়
বোয়িং থেকে আপাতত ১৪টি উড়োজাহাজ কিনতে ৩০–৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরবরাহ শুরু হবে ২০৩১–২০৩৫ সালে, অর্থাৎ বর্তমান বা আসন্ন সরকারের মেয়াদে এর কোনো সরাসরি সুফল মিলবে না। বরং ভবিষ্যতে ডলার সংকট ও মূল্যস্ফীতির কারণে আর্থিক ঝুঁকি বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।

চীন ও যুক্তরাজ্য থেকে জাহাজ কেনা
চীন থেকে চারটি জাহাজ কেনার ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি এবং যুক্তরাজ্যের সঙ্গে একটি হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভে ভেসেল কেনার চুক্তিও স্বাক্ষর করেছে সরকার। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার আলোচনা চলছে।

নবম পে স্কেল : ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য বড় চাপ

প্রস্তাবিত নবম পে স্কেল বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে এই ব্যয় মেটাতে গিয়ে নতুন সরকারকে হয় টাকা ছাপাতে হবে, নয়তো বড় অঙ্কের ঋণের পথে যেতে হবে—যা অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলবে।

‘ভুল সময়ে ভুল সিদ্ধান্ত’

বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক মুস্তফা কে. মুজেরি মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে এমন সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক।

তার ভাষায়, নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা বারবার ভুল সময়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।”

বাড়ছে বিদেশি ঋণের বোঝা

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছর শেষে বৈদেশিক ঋণের দায় দাঁড়িয়েছে ৭৭ বিলিয়ন ডলারে, যা ৫ বছরে প্রায় ৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি। আইএমএফ ও গ্যারান্টিযুক্ত ঋণ যোগ হলে প্রকৃত দায় আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদরা।

ইউনূস সরকারের পাল্টা যুক্তি

সমালোচনার জবাবে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারকে চাপমুক্ত রাখতেই অন্তর্বর্তী সরকার আগেভাগে এসব চুক্তি সম্পন্ন করছে। তবে সাবেক এক অর্থসচিবের মতে, মেয়াদের শেষ সময়ে এক লাখ কোটি টাকার বেশি দায় সৃষ্টি করা প্রশাসনিক শিষ্টাচারবহির্ভূত, যার ফল ভোগ করতে হবে পরবর্তী সরকারকে শুরুতেই।

Visited 25 times, 1 visit(s) today