ব্যয় সংকোচন কেবল কাগজে-কলমেই, ইউনূস সরকারের ঋণ ৪ লাখ কোটি ছাড়ানোর পথে

ব্যয় সংকোচন কেবল কাগজে-কলমেই, ইউনূস সরকারের ঋণ ৪ লাখ কোটি ছাড়ানোর পথে
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

দায়িত্ব নেয়ার সময় রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধন ও ঋণগ্রহণে সতর্ক থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। গত ১৮ মাসে সরকারের ঋণগ্রহণ অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুত বেড়েছে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে মোট ঋণের পরিমাণ ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট ঋণ নেয়া হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০২৪–২৫ অর্থবছরের আগস্ট থেকে জুন পর্যন্ত ১১ মাসে নেয়া হয়েছে ৩ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জুলাই–ডিসেম্বর সময়ে যুক্ত হয়েছে আরও প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা।

এ গতি অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাস শেষে ঋণের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।

কৃচ্ছ্রসাধন বনাম বাস্তবতা

ক্ষমতায় বসেই অন্তর্বর্তী সরকার অতীত সরকারের দুর্নীতি ও অপচয় খতিয়ে দেখতে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠন করে। সেই প্রতিবেদনে সরকারি ক্রয় ও প্রকল্প ব্যয়ে ব্যাপক দুর্নীতির তথ্য উঠে আসে।

আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে সরকারি পণ্য ও সেবা ক্রয়ে প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ১.৬১–২.৮০ লাখ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠে প্রতিবেদনে।

দুর্নীতির এমন চিত্র তুলে ধরার পরও ঋণনির্ভরতা কমেনি, বরং বেড়েছে—এ বিষয়টি এখন অর্থনীতিবিদদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

ঋণের ফাঁদ নিয়ে নীতিনির্ধারকদের সতর্কবার্তা

পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ সম্প্রতি একনেক বৈঠকের পর বলেন, এলডিসি উত্তরণের ফলে বিদেশী ঋণের সুদহার বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে ঋণকে আরও ব্যয়বহুল করবে। তাই অপ্রয়োজনীয় বড় প্রকল্পে ঋণ নেয়া থেকে সরে আসার কথা জানান তিনি।

এর আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানও স্বীকার করেন, দেশ ইতোমধ্যে “ঋণের ফাঁদে” পড়েছে।

প্রকল্প অনুমোদন: পুরোনো বোঝা, নতুন চাপ

দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০টি একনেক সভায় মোট ২৫১টি প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়েছে, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯৮টি প্রকল্প আগের সরকারের সময় নেয়া—মেয়াদ বৃদ্ধি ও পুনর্মূল্যায়নের ফলে এসব প্রকল্পে ব্যয় বেড়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫৩টি নতুন প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা।

অর্থাৎ একদিকে অতীতের প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে নতুন বড় প্রকল্প যুক্ত হয়েছে—যা ঋণচাপ বাড়ার একটি বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ঋণ কোথায় খরচ হচ্ছে?

সরকারি ব্যয়ের গঠন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঋণের বড় অংশই উন্নয়ন খাতে নয়, বরং পরিচালন ব্যয়ে যাচ্ছে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন–ভাতা, পেনশন, ঋণের সুদ এবং ভর্তুকি বাবদ বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে।

২০২৪–২৫ অর্থবছরের আগস্ট–জুন সময়ে পরিচালন খাতে ব্যয় হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ব্যয় হয়েছে আরও ১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা। ১৪ মাসে পরিচালন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা, যেখানে উন্নয়ন ব্যয় ছিল মাত্র ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এডিপির চেয়েও বেশি ঋণ নেয়া মানে উন্নয়ন খাত ছাড়াও পরিচালন ব্যয় মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। রাজস্ব ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই বেতন–ভাতা, সুদ ও ভর্তুকিতে চলে যায়—যা কমানো কঠিন।

রাজস্ব বৃদ্ধির স্থবিরতা

ঋণ ও ব্যয় দ্রুত বাড়লেও রাজস্ব আহরণ সেই অনুপাতে বাড়েনি। ২০২৪–২৫ অর্থবছরের ১১ মাসে রাজস্ব আহরণ হয়েছে ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের জুলাই–ডিসেম্বর সময়ে এসেছে আরও ১ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা। মোট ১৭ মাসে রাজস্ব সংগ্রহ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা—যা ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও ঋণের তুলনায় অপ্রতুল।

অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়ন

সাবেক সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ মনে করেন, “এত কম সময়ে এত বেশি ঋণ সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য সুস্থতার লক্ষণ নয়।”

তার মতে, আয় না বাড়িয়ে ঋণ বাড়ালে ভবিষ্যতে অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হবে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দায়িত্ব নেয়ার সময় অর্থনীতির যে অবস্থা ছিল, তাতে সরকারকে বাধ্য হয়েই ঋণ নিতে হয়েছে। তবে সংস্কারগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হলে এসব ঋণের প্রত্যাশিত সুফল মিলবে না।

চ্যালেঞ্জ সামনে

সব মিলিয়ে যে চিত্রটি স্পষ্ট হচ্ছে তা হলো—অন্তর্বর্তী সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান ও ব্যয়সংযমের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে ঋণনির্ভরতা কমাতে পারেনি। ঋণের বড় অংশ যদি পরিচালন ব্যয়ে চলে যায়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সামনে রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নিলে বাড়তি ঋণচাপ সামলে উন্নয়ন গতি বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

Visited 30 times, 1 visit(s) today