চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের জাফরাবাদ হিন্দুপাড়ায় গত এক সপ্তাহে মন্দির, বসতঘর, খড়ের গাদাসহ সাতটি স্থানে পরিকল্পিতভাবে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনাগুলো স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। বাসিন্দারা রাত জেগে গ্রাম পাহারা দিচ্ছেন, সিসি ক্যামেরা লাগিয়েছেন এবং প্রতিদিনের কাজকর্মের মধ্যেও ভয়ের ছায়া লেগে রয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুসারে, ২৩ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) পর্যন্ত এই ধারাবাহিক অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। প্রথমে তপন ধরের বাড়ির ব্যক্তিগত মন্দিরের পাশে শুকনো পাতার বস্তায় আগুন, তারপর অমিও ধর, কানু নাথ, রতন ধর, অশোক ধর, অনুপ ধরের বাড়িতে খড়ের গাদা, প্লাস্টিক বস্তা ও রান্নাঘরে আগুন—এবং সর্বশেষ মৃদুল সাহার বসতঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে, যাতে ঘরের একাংশ পুড়ে যায়। মৃদুলের স্ত্রী তমালিকা সাহা জানান, দুপুরে তিনি একা থাকা অবস্থায় বারান্দার সামনে আগুন দেখে চিৎকার করলে প্রতিবেশীরা এসে নেভান।
এই ঘটনার সঙ্গে মিল রেখে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায়ও একই ধরনের ধারাবাহিক অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। গত ১ নভেম্বর থেকে ৫০ দিনের মধ্যে ১২টি হিন্দু পরিবারের ঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে—কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঘরের দরজায় তালা মেরে ভেতরে মানুষ থাকা অবস্থায় আগুন লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা অভিযোগ করছেন যে, এসব ঘটনা জাতীয় সংসদ নির্বাচন (ফেব্রুয়ারি ২০২৬) সামনে রেখে সংখ্যালঘু ভোটারদের আতঙ্কিত করে ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে করা হচ্ছে। পাড়ার বাসিন্দা বিপাশ চৌধুরী বলেন, “সব ঘটনা দিনের বেলায় ঘটছে, যখন মানুষ কাজে ব্যস্ত থাকে। এটা স্পষ্ট ষড়যন্ত্র।”
মিরসরাই থানার ওসি ফরিদা ইয়াছমিন জানিয়েছেন, তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তদন্ত চলছে। তবে লিখিত অভিযোগ না পাওয়ায় আইনি পদক্ষেপে বিলম্ব হচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোমাইয়া আক্তার বলেছেন, থানার সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
এদিকে, বিভিন্ন অধিকার সংগঠনের রিপোর্ট অনুসারে, ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত মিরসরাই, রাউজান, পিরোজপুর, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় অন্তত ১৬টি হিন্দু বাড়ি-মন্দিরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে, এবং ১৭ জন হিন্দু ব্যক্তি হত্যার শিকার হয়েছেন। সংখ্যালঘু সংগঠনগুলো দাবি করছে, নির্বাচনকে সামনে রেখে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে হিন্দু ভোটারদের দমিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে।
এই ধারাবাহিক ঘটনাবলী বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের (বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের) নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কের মাত্রা আরও তীব্র করে তুলেছে। প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপ না হলে এই আতঙ্ক আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য মারাত্মক হুমকি।

