বিশেষ প্রতিবেদক
২০২৪-এর জুলাই দাঙ্গার মাধ্যমে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর থেকে এ পর্যন্ত ঢাকা ও চট্টগ্রামের অন্তত ৪-৫শ ছোট-বড় গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। একইসাথে বন্ধ হয়ে গেছে বিসিকের অন্তর্ভুক্ত হাজারো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। বিভিন্ন প্রতিবেদন বলছে, ঝুঁকিতে রয়েছে অন্তত ১ হাজারের বেশি কারখানা। কাজ হারিয়েছেন কয়েক লাখ শ্রমিক।
সেই ধারাবাহিকতায় এবার নীলফামারীর সৈয়দপুরে রপ্তানিমুখী ক্ষুদ্র গার্মেন্টস ও ঐতিহ্যবাহী কারচুপি শিল্প চরম সংকটে পড়েছে।
সুতা ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী পুঁজিসংকট এবং ঝুট কাপড়ের অপ্রতুল সরবরাহের কারণে গত দুই বছরে প্রায় ১৫০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে কাজ হারিয়েছেন প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক ও কর্মচারী।
গাজীপুর-সাভার-আশুলিয়ায় ৩২৭ কারখানা বন্ধ: বেকার দেড় লাখ শ্রমিক, বিপর্যস্ত পরিবার
শিল্প সমিতির তথ্য অনুযায়ী, বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে অন্তত ১০০টি স্থায়ীভাবে এবং ৫০টি অস্থায়ীভাবে তালাবদ্ধ রয়েছে। এর ফলে সৈয়দপুরের শ্রমনির্ভর অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এক্সপোর্টেবল স্মল গার্মেন্টস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (ইএসজিওএ) জানায়, পাকিস্তান আমল থেকেই সৈয়দপুরে ঝুট কাপড়ভিত্তিক পোশাক ও কারচুপি শিল্পের ঐতিহ্য রয়েছে। বিশেষ করে ২০০২ সালের পর এই শিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটে। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম থেকে সংগৃহীত ঝুট কাপড় ব্যবহার করে এখানে ট্রাউজার, শর্টস, জ্যাকেট, টি-শার্ট ও জিনস তৈরি হতো। এসব পণ্যের প্রধান রপ্তানি গন্তব্য ছিল ভারত, নেপাল ও ভুটান।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বড় গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঝুট কাপড়ের সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়। একই সঙ্গে এর দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সৈয়দপুরের ক্ষুদ্র কারখানাগুলোতে।
গার্মেন্টস খাতের সংকট: ১,০০০ কারখানা ঝুঁকিতে, মাসে গচ্চা ২৫০ মিলিয়ন ডলার
মুন্সিপাড়া এলাকার রপ্তানিমুখী খান অ্যান্ড সন্স পোশাক কারখানায় একসময় শতাধিক নারী-পুরুষ শ্রমিক কাজ করতেন। কিন্তু কাঁচামালের সংকট ও আর্থিক দুরবস্থার কারণে শেষ পর্যন্ত কারখানাটি স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
কারখানা শ্রমিক আবুল বাশার বলেন, “সুতা ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়া এবং দীর্ঘদিনের পুঁজিসংকটের কারণে উপজেলার প্রায় ১৫০টি কারচুপি শিল্পকারখানাও বন্ধ হয়ে গেছে। এতে ১০ হাজারের বেশি দক্ষ কারিগর বেকার হয়ে পড়েছেন।”
শ্রমিক মুক্তা বেগম জানান, “ঐতিহ্যবাহী ছোট-বড় দেড় শতাধিক কারচুপি কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার নারী-পুরুষ জীবিকা হারিয়েছেন। অনেক পরিবার এখন মানবেতর জীবনযাপন করছে।”
শহরের রসুলপুর এলাকার বাসিন্দা বিলকিস আক্তার বলেন, “স্বামীর মৃত্যুর পর কারচুপি কারখানায় কাজ করেই সংসার চালাতাম। এখন সেই কারখানাটিও বন্ধ। সামনে কীভাবে চলব, বুঝতে পারছি না।”
রপ্তানিমুখী ক্ষুদ্র গার্মেন্টস মালিক শিল্প সমিতির সভাপতি আকতার হোসেন খান বলেন, “ছোট-বড় অসংখ্য কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এই শিল্প বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে সরকারি সহায়তা ও নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন।”
সৈয়দপুরের এই শিল্পসংকট শুধু কারখানা মালিকদের নয়, হাজারো শ্রমজীবী মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগের নতুন অধ্যায় যোগ করেছে।
