বিশেষ প্রতিবেদক
ভারতীয় আধিপত্যবাদের সমালোচনা করা হলেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে নীরবতা পালনের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ করে বলে মনে করেন কবি ও রাজনৈতিক চিন্তক ফরহাদ মজহার।
কারণ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জামায়াতে ইসলামীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের দৃষ্টান্ত টেনে আনেন।
তিনি জানান, অনেকেই ভারতবিরোধিতার কথা বলেন এবং তিনি নিজেও ভারতের আধিপত্য স্বীকার করেন। কিন্তু একই সঙ্গে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রসঙ্গ কেন এড়িয়ে যাওয়া হয়—সে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তার ভাষায়, গাজায় পাঠানো স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নিয়ে জামায়াত কোনো আপত্তি না তোলায় স্পষ্ট হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দলটির নীতি ও সম্পর্ক রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটেই যুক্তরাষ্ট্র আগেভাগে এমন বক্তব্য দিচ্ছে বলে তিনি মনে করেন এবং একে ‘ভয়ঙ্কর অশনিসংকেত’ হিসেবে দেখছেন।
তার দাবি, ৫ই আগস্টের অনেক আগেই এসব বিষয় নিয়ে তিনি কথা বলেছেন, কিন্তু তখন সাংবাদিকরা তা গুরুত্ব দিয়ে দেখেননি।
আজ ২৩শে জানুয়ারি, শুক্রবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ‘দেশব্যাপী গ্যাস, বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির সংকট: সমাজের করণীয়’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পাঠচক্র এবং লিখিত গ্রন্থের মাধ্যমে তরুণদের জুলাইয়ের দাঙ্গা-সহিংসতার মাধ্যমে সরকার পতন ঘটাতে গত কয়েক বছর ধরে উদ্বুদ্ধ করে চলেছেন ফরহাদ মজহার।
আজকের আলোচনায় দেওয়া বক্তব্যে জুলাই দাঙ্গার আরেক সুবিধাভোগী জামায়াতে ইসলামীর সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক মাখামাখিকে ‘ভয়ঙ্কর অশনিসংকেত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
ফরহাদ মজহারের দাবি, জুলাই-আগস্টের সংঘাতের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের ঘটনাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যুক্তরাষ্ট্রের করা ‘রেজিম চেঞ্জ’ পরিকল্পনা হিসেবে দেখিয়ে বিক্ষোভকারীদের অবদানকে খাটো করা হচ্ছে।
ওয়াশিংটন পোস্ট || বাংলাদেশে উগ্রবাদের প্রসারের মধ্যেই জামায়াতের সাথে বন্ধুত্ব চায় যুক্তরাষ্ট্র, কূটনীতিকের অডিও ফাঁস
এক সাংবাদিক যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্ট-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দেন। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী। তবে জামায়াত যদি শরিয়া আইন চালু করে, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া পণ্যের ওপর শতভাগ শুল্ক আরোপের সম্ভাবনাও রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ফরহাদ মজহার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলেরই কোনো না কোনো ধরনের সম্পর্ক রয়েছে—কেউ সরাসরি, কেউ পরোক্ষভাবে।
তিনি বলেন, ৫ই আগস্টের ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে যে বয়ান তৈরি করা হয়েছে, তাতে বিষয়টিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে একটি রেজিম পরিবর্তন হিসেবেই তুলে ধরা হচ্ছে।
তার মতে, শেখ হাসিনাকে সরানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো বড় বিষয় নয়, কারণ যুক্তরাষ্ট্র চাইলে সেটি করতেই পারে। বরং আসল প্রশ্ন হলো—নতুন বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি কীভাবে গড়ে তোলা হবে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র একটি শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক শক্তি এবং বাস্তবে আন্তর্জাতিক আইন কার্যকর নেই বললেই চলে—ট্রাম্পের আচরণই তার প্রমাণ।
বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ফরহাদ মজহার বলেন, এই রূঢ় ও বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে তিনি ১৭ কোটি মানুষকে নিয়ে কীভাবে টিকে থাকবেন, সেটাই তার বড় চিন্তা।
তিনি শান্তিপূর্ণভাবে ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে চান এবং কোনো যুদ্ধ বা সংঘাতে জড়াতে চান না বলেও মন্তব্য করেন।
রাষ্ট্র সংস্কার ও নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল জনগণের জীবনধারণ নিশ্চিত করতে সক্ষম একটি রাষ্ট্র গঠন করা। কিন্তু সেই লক্ষ্য এখন উপেক্ষিত হচ্ছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, লুটপাটতন্ত্রের অবসান না ঘটিয়ে নির্বাচন হলে সেই সরকার কখনোই জনগণের সরকার হবে না।
দেশে চলমান গ্যাস, বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির সংকট নিয়েও কথা বলেন ফরহাদ মজহার।
তার মতে, এসব সংকট প্রাকৃতিক নয়; বরং কাঠামোগত ও রাজনৈতিক। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়লেও সাধারণ মানুষ সেবা না পাওয়াকে তিনি লুটপাটমূলক ব্যবস্থার স্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বিক্ষোভ-সহিংসতায় নেতৃত্বদানকারী ছাত্র নেতাদের অনেকেই ফরহাদ মজহারের পাঠচক্রের সদস্য ছিলেন। বিগত কয়েক বছর ধরে সেখানে তারা সরকার পরিবর্তনের ছকি কষছিলেন, এমন দাবি করেন খোদ উপদেষ্টা মাহফুজ আলমসহ সংশ্লিষ্ট অনেকেই। ফরহাদ মজহারের চিন্তা-ভাবনা তাদের অনুপ্রাণিত করেছে বলেও জানান।
