চাকরি রক্ষায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার ছেলেভোলানো নিশ্চয়তা: লুটের অস্ত্র উদ্ধার না হলেও নির্বাচনে ব্যবহৃত হবে না

চাকরি রক্ষায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার ছেলেভোলানো নিশ্চয়তা: লুটের অস্ত্র উদ্ধার না হলেও নির্বাচনে ব্যবহৃত হবে না
শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক

আসন্ন ১২ই ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের দাঙ্গার সময় বিভিন্ন থানা, পুলিশ ক্যাম্প ও নিরাপত্তা স্থাপনা থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদের বড় অংশ এখনও উদ্ধার হয়নি।

সরকারি তথ্য বলছে, প্রায় ৫,৭৫০টিরও বেশি অস্ত্র লুট হয়েছিল, যার মধ্যে হালকা মেশিনগান, সাবমেশিনগান, রাইফেল, পিস্তলসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র রয়েছে। এর সাথে রয়েছে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদও।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, এখনও ১,৩৬২টির মতো অস্ত্র উদ্ধার হয়নি, যা নির্বাচনী সহিংসতার আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে।

এই প্রেক্ষাপটে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী নিশ্চিত করে বলেছেন যে, লুট হওয়া এসব অস্ত্র নির্বাচনের সময় ব্যবহার হবে না।

তিনি এ-ও দাবি করেছেন যে, উদ্ধারের প্রক্রিয়া চলমান এবং নির্বাচনের আগে সব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হবে। কিন্তু এই নিশ্চয়তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক হাস্যরস ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

জনগণের প্রশ্ন—যে অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সেই অস্ত্র নির্দিষ্টভাবে নির্বাচনে ব্যবহার হবে না বলে কীভাবে এত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিশ্চয়তা দিচ্ছেন উপদেষ্টা? এর মানে কি তিনি জানেন এসব অস্ত্র কাদের কাছে আছে? নাকি অবৈধ অস্ত্রধারীরা নির্বাচনের পক্ষের লোক বলেই এত আত্মবিশ্বাসের সাথে নিশ্চয়তা দিচ্ছেন?

অনেকে মনে করছেন, এটি লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা এবং শঙ্কিত ভোটারদের ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করার জন্যই এই মিথ্যা আশ্বাস।

অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ার কারণ দেখিয়ে উপদেষ্টা বলেছেন, “অস্ত্র হয়ত লুটকারীরা খালে-বিলে ফেলে দিছে; তাই উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না।”

আরও বিতর্কিত হয়েছে উপদেষ্টার বক্তব্য যখন তিনি সকল অন্যায়, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির দায় আওয়ামী লীগের কর্মীদের উপর চাপিয়েছেন। অথচ সারা দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করছে যে, ক্ষমতার দখলদারিত্ব নিয়ে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সংঘাত, মব সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি চলছে।

অনেকেই তাই অস্ত্র সংক্রান্ত মন্তব্যটিকে উপদেষ্টার চাকরি বাঁচানোর চেষ্টা হিসেবে দেখছেন।

এর পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক ঘটনা—ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড। হাদি হত্যায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে ব্যর্থতার অভিযোগে তার সমর্থকরা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেয়। শাহবাগে বিক্ষোভ, সমাবেশসহ প্রতিবাদের মুখে উপদেষ্টা অল্পের জন্য পদ রক্ষা করেন।

এরপর থেকে তার জুলাই দাঙ্গায় জড়িতদের মন ভোলানো বক্তব্যকে অনেকে উপদেষ্টার চাকরি বাঁচানোর প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখছেন।

হাইকোর্টে রিট এবং আইনি নোটিশও দায়ের হয়েছে—লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন স্থগিত রাখার দাবিতে। রিটকারীরা উল্লেখ করেছেন, অবৈধ অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে থাকায় ভোটার ও প্রার্থীদের জীবন হুমকির মুখে। হাদি হত্যার ঘটনাকেই তারা এর প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

এসব কারণে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার বাস্তবতাবিবর্জিত, ছেলেভোলানো বক্তব্য সাধারণ জনগণের মনে কোনো স্বস্তি বা নিশ্চয়তা যোগাতে পারছে না। বরং এটি নিরাপত্তাহীনতা ও সরকারের ব্যর্থতার প্রতি আরও অবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলছে। নির্বাচনের আগে অস্ত্র উদ্ধার ও আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা না গেলে, ভোটারদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে—যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

Visited 8 times, 1 visit(s) today