ঈশ্বরদী প্রতিনিধি
৪ঠা জানুয়ারি, ২০২৬ঃ পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পে কর্মরত রাশিয়ান নাগরিকদের রহস্যজনক ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা যেন থামছেই না। সর্বশেষ আজ ৪ জানুয়ারি (রবিবার) সকালে গ্রিন সিটির ৮ নম্বর আবাসিক ভবনের তৃতীয় তলার ৩১ নম্বর কক্ষ থেকে রাশিয়ান নাগরিক রাইবাকভ মাকসিম (৩০)-এর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এটমটেক এনার্গো কোম্পানির কর্মী ছিলেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাকসিমের রুমমেট রাশিয়ান নাগরিক ফ্রোলিওভ কক্সবাজারে ছুটি কাটিয়ে সকালে কক্ষে ফিরে মেঝেতে তাকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। পরে কর্তৃপক্ষকে জানালে কোম্পানির নিরাপত্তা টিম, রাশিয়ান চিকিৎসক এবং ঈশ্বরদী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, স্ট্রোকজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাবনা জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে, যারা দূতাবাসের মাধ্যমে এটি রাশিয়ায় পাঠাবে।
ঈশ্বরদী থানার ওসি মো. মমিনুজ্জামান বলেন, “ঘটনাস্থলে সুরতহাল করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।”এই ঘটনা রূপপুর প্রকল্পে রাশিয়ান কর্মীদের মৃত্যুর দীর্ঘ তালিকায় যুক্ত হলো। চলতি ২০২৬ সালের শুরুতেই এটি সর্বশেষ সংযোজন। গত বছরগুলোতে একাধিক রিপোর্ট অনুসারে, প্রকল্পটিতে কর্মরত রাশিয়ান নাগরিকদের মধ্যে অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা বারবার ঘটেছে। উদাহরণস্বরূপ:
- ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে গ্রিন সিটিতে ইভান কাইটমাজোভ (৪০) নামে এক রাশিয়ান কর্মীর মরদেহ উদ্ধার হয়, যা প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হয়।
- একই মাসে পাশাতারুক ক্সেনেলা (৪০) নামে আরেক রাশিয়ান উঁচু ভবন থেকে লাফ দিয়ে মারা যান।
- ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কারপোভ ক্রিল (২৬) নামে এক ইলেকট্রিশিয়ানের মরদেহ ভাড়া বাসা থেকে উদ্ধার হয়, যা স্ট্রোকজনিত বলে সন্দেহ করা হয়।
এর আগে ২০২২ সালে মাত্র এক সপ্তাহে পাঁচ রাশিয়ান নাগরিকের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে কয়েকটি অস্বাভাবিক বলে পুলিশের ধারণা ছিল। কিছু ক্ষেত্রে হৃদরোগ, স্ট্রোক বা আত্মহত্যার কথা বলা হলেও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রায়শই প্রকাশ্যে আসেনি। গত আট বছরে অন্তত ২৫ জন রাশিয়ান নাগরিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যা প্রকল্পের নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
প্রকল্প কর্তৃপক্ষ বা রাশিয়ান দূতাবাসের পক্ষ থেকে এসব মৃত্যুকে সাধারণত স্বাস্থ্যগত কারণ বা দুর্ঘটনা বলে উল্লেখ করা হয়, তবে স্থানীয়ভাবে রহস্য ও উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পে কর্মরত হাজার হাজার রাশিয়ান কর্মীর মানসিক চাপ, কাজের পরিবেশ এবং স্বাস্থ্য সুবিধার অভাব এসব ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।রূপপুর প্রকল্প বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের মাইলফলক হলেও এ ধরনের ঘটনা কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে ধরছে।
