হুজি সংশ্লিষ্টদের নিয়ে ঢাকায় গোপন সফরে শীর্ষ তালেবান কর্মকর্তা, সমমনা স্থানীয় ধর্মীয় নেতাদের সাথে সাক্ষাত 

হুজি সংশ্লিষ্টদের নিয়ে ঢাকায় গোপন সফরে শীর্ষ তালেবান কর্মকর্তা, সমমনা স্থানীয় ধর্মীয় নেতাদের সাথে সাক্ষাত 
শেয়ার করুন

বিশেষ সংবাদদাতা

শীর্ষ তালিবান নেতা মোল্লা নুর আহমদ নুর এখন ঢাকায় আছেন। তিনি আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের একজন শীর্ষ কূটনীতিক। তিনি মোল্লা জাওয়ান্দি নামেও পরিচিত। তিনি দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফার্স্ট পলিটিক্যাল ডিভিশনের মহাপরিচালক। তিনি প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় যাচ্ছেন। তিনি বিভিন্ন কওমি মাদ্রাসায় যাচ্ছেন এবং কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। তিনি আবু সায়েম খালেদের সহায়তায় কয়েকটি সফর করেছেন।

পুলিশের সিটিটিসি ইউনিট এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে এই সফর সম্পর্কে তাঁদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। তাঁরা বলেন যে মোল্লা জাওয়ান্দির কার্যক্রম তাঁরা নজরে রাখছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এবং পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম সাড়া দেননি। মুখপাত্র এস এম মাহবুবুল আলমও কিছু বলেননি। মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে কোনো হালনাগাদ তথ্য তাঁদের কাছে নেই।

বাংলাদেশে আফগান দূতাবাসের জনসংযোগ কর্মকর্তা আফনানও নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেননি। তিনি বলেছেন যে তিনি এ বিষয়ে তথ্য দিতে অপারগ।

এয়ারলাইন্সের তথ্য অনুযায়ী মোল্লা জাওয়ান্দি ২১ ডিসেম্বর রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ঢাকায় পৌঁছান। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানান বাংলাদেশ–আফগানিস্তান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান আবু সায়েম খালেদ।

মোল্লা জাওয়ান্দিকে তালেবান সরকারের এশিয়াবিষয়ক নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। সূত্রগুলো বলছে তিনি ঢাকায় কিছু রাজনৈতিক ও মাদ্রাসা ভিত্তিক গোষ্ঠির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এর মধ্যে আছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মাদ্রাসা শিক্ষক ও বেফাকের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক। তাঁকে ঘিরে নিষিদ্ধঘোষিত হরকাতুল জিহাদের সন্দেহভাজন একাধিক শীর্ষ নেতা দেখা গেছে।

মোল্লা জাওয়ান্দি আবু সায়েম খালেদের নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার জামিয়া কারামিয়া মাদ্রাসায় গিয়েছেন। তিনি রাজধানীর ফরিদাবাদ মাদ্রাসায় গিয়েছেন। তিনি মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসায়ও গিয়েছেন। আবু সায়েম খালেদ বলেছেন যে মোল্লা জাওয়ান্দি সরকারের মেহমান। তবে তিনি বলেননি কোন দপ্তরের মেহমান।

সম্পর্কিত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন যে আবু সায়েম খালেদ আগে আফগানিস্তান সফর করেছেন। তাঁর সফরে আরও পাঁচজন ছিলেন। তাঁরা দুবাই হয়ে আফগানিস্তানে গিয়েছিলেন এবং পরে পাকিস্তান হয়ে ফিরেছিলেন। সূত্র বলছে আবু সায়েম খালেদ হুজির নারায়ণগঞ্জ জেলা আমির ছিলেন বলে সন্দেহ আছে। তবে তিনি তা অস্বীকার করেছেন।

সমাবেশের বিষয়ে জানা গেছে যে ২৭ ডিসেম্বর রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে বিএসিসিআই একটি সমাবেশ করে। সমাবেশের নাম ছিল “ব্লুপ্রিন্ট অব দ্য ইসলামিক এমিরেট”। সেখানে মোল্লা জাওয়ান্দির থাকার কথা ছিল। কিন্তু তিনি যাননি। সমাবেশে হুজির সাবেক আমির রহমতুল্লাহ ওরফে শেখ ফরিদের পরিবারের সদস্যদের দেখা গেছে। শেখ ফরিদের আফগান সফরের ইতিহাস রয়েছে। তাঁর ভাইদের মধ্যে অনেকেই হুজির সঙ্গে জড়িত বলে উল্লেখ আছে।

সমাবেশে অংশ নেওয়া কয়েকজনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মামলার অভিযোগ রয়েছে। আয়োজকদের ব্যাখ্যা পরিষ্কার ছিল না। আবু সায়েম খালেদ বলেছেন যে অনুষ্ঠানটি ওপেন প্রোগ্রাম।

সমাবেশে খাবার সরবরাহ করেছে আল-মারকাজুল ইসলামী। সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মুফতি শহিদুল ইসলাম। বর্তমানে চেয়ারম্যান তাঁর ছেলে হামযাহ বিন শহিদুল ইসলাম। প্রতিষ্ঠানের গেস্ট অ্যাফেয়ার্সের দায়িত্বে থাকা মাসুম বিল্লাহ বলেছেন যে তাঁরা প্রস্তাব পেয়ে খাবার সরবরাহ করেছেন। তিনি বলেছেন মোল্লা জাওয়ান্দি সম্ভবত আরও চার থেকে পাঁচ দিন থাকতে পারেন।

এই সফর এমন সময়ে হচ্ছে যখন দেশে ওসমান হাদি বা শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে আহত করার ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনায় আছে। তিনি পরে সিঙ্গাপুরে মারা যান। এই ঘটনার পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও সামনে।

দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বলেছেন যে এই সফর নিয়ে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে। তিনি বলেছেন সহিংসতার আশঙ্কা ও নির্বাচনমুখী সময়ে এমন সফর গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক তৈরি করতে পারে। তিনি বলেছেন আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক, পাকিস্তান ও ভারতের অবস্থান এবং আমির খান মুত্তাকির মতো তালেবান নেতাদের কূটনৈতিক যোগাযোগও বিষয়টিকে আরও জটিল করছে।

মাওলানা মামুনুল হক আগে আফগানিস্তান সফর করেছিলেন। সেখানে তিনি আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোল্লা আমির খান মুত্তাকির সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন। তিনি বলেন যে তাঁকে বাংলাদেশ–আফগানিস্তান কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ে ভূমিকা নিতে অনুরোধ করা হয়।

নারায়ণগঞ্জের ওই মাদ্রাসায় আগেও বিদেশি আসা–যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সেখানে আজাদ কাশ্মীরের তথ্যমন্ত্রী পীর মাযহার সাঈদ শাহ সফর করেছিলেন।

Visited 87 times, 1 visit(s) today