❐ বিডি ডাইজেস্ট ডেস্ক
মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, মুক্তিবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ এবং বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল আব্দুল করিম খন্দকার, বীর উত্তম, পিএসএ (অব.)-এর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে আজ ২১শে ডিসেম্বর রোববার বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ঘাঁটি বাশারের প্যারেড গ্রাউন্ডে ফিউনারেল প্যারেড ও জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় তাঁকে সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে মহামান্য রাষ্ট্রপতির পক্ষে সামরিক সচিব, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, এসবিপি, ওএসপি, এসজিপি, পিএসসি, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান, ওএসপি, এনপিপি, এনডিসি, এনসিসি, পিএসসি এবং বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চীফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন, বিবিপি, ওএসপি, জিইউপি, এনএসডব্লিউসি, পিএসসি মরহুমের কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
এছাড়াও মরহুমের পরিবারবর্গ, সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সশস্ত্র বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের সামরিক সদস্যরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
ফিউনারেল প্যারেড শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে বিমান বাহিনী ঘাঁটি বাশারে অবস্থিত শাহীন কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রতি বিশেষ সম্মান জানিয়ে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর পক্ষ থেকে ফ্লাই পাস্ট পরিচালনা করা হয়।
এয়ার ভাইস মার্শাল আব্দুল করিম খন্দকার ১৯৩০ সালের ১লা জানুয়ারি পাবনা জেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম খন্দকার আব্দুল লতিফ এবং মাতা মরহুমা আরেফা খাতুন। শিক্ষাজীবনে তিনি মালদা জেলা স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন, রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং পিএএফ কলেজ, রিসালপুর থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
তিনি ১৯৫১ সালের ৫ই জানুয়ারি পাকিস্তান বিমান বাহিনী একাডেমিতে যোগদান করেন এবং ১৯৫২ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর জিডি (পি) শাখায় কমিশন লাভ করেন। কর্মজীবনে তিনি একজন দক্ষ ও সাহসী ফাইটার পাইলট হিসেবে L-19, T-6G, টেম্পেস্ট, ফিউরি, T-33, F-5 ও F-86 বিমানসহ বিভিন্ন ধরনের উড়োজাহাজে ৩৪০০ ঘণ্টারও বেশি উড্ডয়ন সম্পন্ন করেন।
পাশাপাশি তিনি জেট ইন্সট্রুমেন্ট রেটিং, ফ্লাইং ইন্সট্রাক্টরস এবং এয়ার স্টাফ কোর্সসহ একাধিক পেশাগত প্রশিক্ষণ অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে শেষ করেন।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে ঢাকায় অবস্থিত পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ঘাঁটিতে সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে কর্মরত অবস্থায় তিনি সাতজন বাঙালি কর্মকর্তা ও কয়েকজন বিমানসেনাকে সঙ্গে নিয়ে ১২ই মে ঢাকা ত্যাগ করে ত্রিপুরার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন এবং ১৫ই মে মতিননগরে পৌঁছান। পরবর্তীতে মুজিবনগর সরকার তাঁকে মুক্তিবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করে।
এই দায়িত্বে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, অপারেশন পরিকল্পনা ও যুদ্ধক্ষেত্রের সার্বিক তদারকিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারতের ডিমাপুরে তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠে প্রথম বাংলাদেশ বিমান বাহিনী। মাত্র নয়জন কর্মকর্তা, ৫৭ জন বিমানসেনা এবং তিনটি বিমান নিয়ে গঠিত এই বাহিনী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে একাধিক সফল অভিযান পরিচালনা করে।
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিনিধি ও মুক্তিযুদ্ধের উপ-অধিনায়ক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ১৯৭২ সালে তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়।
স্বাধীনতার পর ৭ই এপ্রিল ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে স্বল্প সময়ের মধ্যে বিমান বাহিনীতে একটি ফাইটার স্কোয়াড্রন, একটি হেলিকপ্টার স্কোয়াড্রন এবং দুটি রাডার ইউনিট অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে তিনি জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বাংলাদেশ বিমানের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
দীর্ঘ ২৩ বছর ১৯ দিনের কমিশনপ্রাপ্ত চাকরি শেষে ১৯৭৫ সালের ১৫ই অক্টোবর তিনি অবসর গ্রহণ করেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি ১৯৭৬ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় এবং ১৯৮২ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা, আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবেও দেশসেবায় নিয়োজিত ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ ও রাষ্ট্রগঠনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১১ সালে তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। তাঁর স্মরণে ও অবদানের সম্মানার্থে ২০২৫ সালের ১০ই এপ্রিল বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটির নামকরণ করা হয় তাঁর নামে।
এই বীর সেনানীর প্রয়াণে জাতি হারালো এক দূরদর্শী সামরিক নেতা, দক্ষ সংগঠক এবং নিবেদিতপ্রাণ দেশসেবককে।

