বিশেষ প্রতিবেদক
দেশের রাজনীতিতে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদীর সক্রিয় সময়কাল ছিল মাত্র ২৮৮ দিন—২০২৫ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি থেকে ১২ই ডিসেম্বর পর্যন্ত। এই স্বল্প সময়েই তিনি আলোচনায় আসেন মূলত বাংলাদেশের মৌলবাদী গোষ্ঠীর রাজনীতিতে প্রবেশ ও সংগঠিত উত্থানের একটি দৃশ্যমান প্রতিনিধি হিসেবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গোয়েন্দা সূত্রগুলোর মতে, এই সময়কালে হাদীর রাজনৈতিক ভূমিকা ব্যক্তি উদ্যোগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় একটি নির্দিষ্ট আদর্শিক গোষ্ঠীর কৌশলগত বিস্তারে।
রাজনীতিতে প্রবেশ: ফেব্রুয়ারি–মার্চ
২৮শে ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে রাজধানীতে আয়োজিত একটি সমাবেশে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে রাজনৈতিক বক্তব্য দেন হাদী। ওই সমাবেশে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তা, ‘সংস্কৃতির অবক্ষয় ও নৈতিক শাসন’ প্রতিষ্ঠার দাবি সামনে আনেন তিনি। উপস্থিত একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী ও আয়োজক কমিটির একটি সূত্র জানায়, ওই কর্মসূচির পেছনে একটি পরিচিত মৌলবাদী সংগঠনের লজিস্টিক ও জনসমাগম সহায়তা ছিল।
মার্চ মাসজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাদীর বক্তব্য ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এসব কন্টেন্টে ধর্মীয় পরিচয়কেন্দ্রিক রাজনীতি, নারী ও সংস্কৃতি বিষয়ে কট্টর অবস্থান এবং রাষ্ট্রীয় নীতিতে ধর্মের প্রভাব বৃদ্ধির দাবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সংগঠিত তৎপরতা: এপ্রিল–জুন
এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে হাদী দেশের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ১২টি সমাবেশ ও আলোচনা সভায় অংশ নেন বলে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের কর্মসূচি তালিকা থেকে জানা যায়। এসব কর্মসূচির প্রায় সবগুলোতেই একই আদর্শিক বক্তব্য পুনরাবৃত্তি হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক অধ্যাপক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, “হাদীর বক্তব্যে নতুনত্ব খুব একটা ছিল না। তবে তাকে সামনে রেখে মৌলবাদী গোষ্ঠী মূলধারার রাজনীতিতে নিজেদের বক্তব্য পুনঃপ্রবেশ করানোর সুযোগ পেয়েছে।”
প্রভাব বিস্তার ও বিতর্ক: জুলাই–সেপ্টেম্বর
জুলাই মাসে রাজধানীর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে আয়োজিত কর্মসূচিতে হাদীর বক্তব্য ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ওই বক্তব্যে ভিন্নমত ও ভিন্ন সংস্কৃতিকে ‘রাষ্ট্রের জন্য হুমকি’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
এ সময় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও প্রতিক্রিয়া আসে। একটি মানবাধিকার সংগঠনের বিবৃতিতে বলা হয়, “হাদীর বক্তব্য অসহিষ্ণুতা উসকে দিচ্ছে এবং গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত করছে।”
অন্যদিকে, মৌলবাদী গোষ্ঠীর একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র দাবি করে, হাদী কেবল “ধর্মপ্রাণ মানুষের কণ্ঠস্বর” তুলে ধরছেন।
রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট: অক্টোবর–ডিসেম্বর
অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের প্রথমার্ধ পর্যন্ত হাদী রাজনৈতিকভাবে আরও সরব হন। ৫ নভেম্বর একটি অনলাইন লাইভ আলোচনায় তিনি বলেন, “রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মীয় মূল্যবোধই শেষ কথা হওয়া উচিত।” এই বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেয়।
১২ই ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে সর্বশেষ একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে হাদীর ২৮৮ দিনের সক্রিয় রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ হয়। এরপর থেকে তিনি প্রকাশ্য রাজনৈতিক তৎপরতায় আর দেখা যাননি।
বিশ্লেষণ ও প্রতিক্রিয়া
গোয়েন্দা সংস্থার একটি সূত্র জানায়, এই ২৮৮ দিনে হাদী মূলত মৌলবাদী গোষ্ঠীর ফ্রন্ট ফিগার হিসেবে কাজ করেছেন। তাদের ভাষ্য, তার জনপ্রিয়তা ও আলোচনাকে ব্যবহার করে সংগঠনটি তরুণদের মধ্যে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করেছে।
তবে রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, হাদীর উত্থান ব্যক্তি রাজনীতির চেয়ে একটি প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক বলেন, “হাদীর ঘটনা দেখায়, কীভাবে স্বল্প সময়ে কাউকে সামনে রেখে আদর্শিক গোষ্ঠী রাজনৈতিক স্পেস দখলের চেষ্টা করে।”
সব মিলিয়ে, মাত্র ২৮৮ দিনের রাজনৈতিক সক্রিয়তায় হাদী ব্যক্তি রাজনীতিবিদ হিসেবে যতটা না পরিচিত হয়েছেন, তার চেয়ে বেশি পরিচিতি পেয়েছেন বাংলাদেশের মৌলবাদী গোষ্ঠীর রাজনীতিতে প্রবেশ ও উত্থানের প্রতীক হিসেবে। এই প্রবণতা ভবিষ্যতে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় কী প্রভাব ফেলবে—সে প্রশ্ন এখনো খোলা রয়েছে।
