‘রাজনীতি করব না’ আত্মত্যাগ থেকে সরাসরি নমিনেশন—তরুণ তিন উপদেষ্টার দ্বিচারিতা ফাঁস
নিজস্ব প্রতিবেদক
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে থাকা দুই ছাত্র প্রতিনিধি আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও মাহফুজ আলম অবশেষে পদত্যাগ করেছেন। গত বুধবার সন্ধ্যায় প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করে তারা পদত্যাগপত্র জমা দেন। পদত্যাগের ঘোষণা এসেছে এমন সময়, যখন দুজনের বিরুদ্ধেই উঠেছে ‘দ্বিচারিতা’, ‘রাজনৈতিক সুবিধা গ্রহণ’ ও ‘জুলাই চেতনা’র সাথে ‘নৈতিক প্রতারণা’র অভিযোগ।
এর আগে আসিফ মাহমুদ প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন যে তিনি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবেন, তাই উপদেষ্টা পদ ছাড়বেন—যদিও উপদেষ্টা হওয়ার সময় তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে তিনি কখনো রাজনীতি করবেন না, নির্বাচনে প্রার্থী হবেন না। মাহফুজ আলমও একই অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে দুজনই আগে থেকেই নির্বাচনী প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছিলেন, যার পরিণতিতে পদত্যাগের নাটকীয় সিদ্ধান্ত।
উপদেষ্টা নিয়োগের সময় সারজিস আলম বলেছিলেন—নাহিদ এবং আসিফের জন্য উপদেষ্টা হওয়া যেমন একটি অর্জন, তেমনি দেশের মানুষের স্বার্থে আত্মত্যাগও বটে। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারে থাকলে তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না।
তিনি আরও বলেছিলেন—তরুণরা কেউ সরকারের ভেতরে থাকবে, কেউ রাজপথে; কেউ শিক্ষাঙ্গন গড়ে তুলবে, আর কেউ সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র দাঁড়িয়েছে সম্পূর্ণ উল্টো।যে ‘আত্মত্যাগ’কে দেশের স্বার্থে বলা হয়েছিল, সেটিই পরিণত হয়েছে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়ার সিঁড়িতে। একদিকে উপদেষ্টার পদমর্যাদা, অন্যদিকে দল ও নেতাদের সঙ্গে গোপন চুক্তি—এমন অভিযোগ এখন সোচ্চার নানা মহলেই।
দলীয় স্বার্থে বেইমানি, নৈতিকতা উপেক্ষা—তরুণ উপদেষ্টাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
রাজনীতিতে না যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে উপদেষ্টা হওয়া—এরপর ক্ষমতার ছাতার নিচে নিরাপদ অবস্থান তৈরি করে আবার রাজনৈতিক মাঠে নেমে নমিনেশন তোলা এই আচরণকে অনেকেই দেখছেন জুলাই স্পিরিটের সাথে ‘নৈতিক প্রতারণা’ হিসেবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়—এটি একদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করেছে, অন্যদিকে তরুণ নেতৃত্বের সততা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
দুর্নীতির অভিযোগও ঘিরে ধরছে নাহিদ-আসিফ-মাহফুজকে
এই তিন তরুণ নেতার বিরুদ্ধে আগে থেকেই উঠেছিল বিভিন্ন অভিযোগ—অর্থ-বিত্তের সুবিধা নিয়ে কাজ না করা,ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করতে উপদেষ্টা পরিচয় ব্যবহার,বিভিন্ন দপ্তরে কাজে হস্তক্ষেপের অভিযোগ,ছাত্র সংগঠনের নাম ব্যবহার করে অনৈতিক প্রভাব খাটানো,উপদেষ্টা পদকে মূলধন হিসেবে ব্যবহার নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্যারিয়ার গড়া।
বিশেষ করে আসিফ ও মাহফুজের বিরুদ্ধে অভিযোগ—উপদেষ্টার ক্ষমতা ব্যবহার করে বিভিন্ন এলাকায় নিজেদের নির্বাচনী গ্রুপ তৈরি করা এবং টেন্ডার-সংক্রান্ত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা। যদিও তারা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবে সরকারের ভেতরের একাধিক সূত্র বলছে—“তাদের ভূমিকা শুরু থেকেই সন্দেহজনক ছিল।”
এই দ্বিচারিতার পর সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের ওপর। তরুণ সদস্যদের মাধ্যমে ‘বিপ্লবী চেতনা’ আনার যা লক্ষ্য ছিল, তা উল্টো বিশ্বাসঘাতকতা ও রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির কেলেঙ্কারিতে রূপ নিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহমুদ জামান বলেন—তাদের দেশের মানুষের প্রতিনিধি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারা নিজেদের দলের স্বার্থকেই বড় করেছে। পদ পাওয়ার পরই আচরণ বদলে যায়।
তবে এসব বিষয়ে জানতে নাহিদ, আসিফ এবং মাহফুজের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তারা সাড়া দেননি।
