‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যায় ৫ আগস্টের পর থেকেই সারাদেশে চাঁদাবাজির মহোৎসব চলমান

‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যায় ৫ আগস্টের পর থেকেই সারাদেশে চাঁদাবাজির মহোৎসব চলমান
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

সহিংসতা ও দাঙ্গার মাধ্যমে ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাত করার পর থেকে দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে চাঁদাবাজি চলমান রয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যা দিয়ে, মামলা-হামলার ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা দাবি করছে এনসিপি, জামায়াত-শিবির, বিএনপি, গণঅধিকার পরিষদসহ ইউনূস সরকারের ঘনিষ্ট নানা রাজনৈতিক ও প্রেশার সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী।

রাজনৈতিক কর্মী ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, শিক্ষকসহ নানা শ্রেণির মানুষ এ ধরনের চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি হলেও তারা আইনের কাছ থেকে প্রতিকার পাচ্ছেন না। চাঁদা না দিলে বরং তাদেরকে ফ্যাসিস্ট ট্যাগ দিয়ে পুলিশে তুলে দিচ্ছে চাঁদাবাজরা। পাওনা টাকা না দিয়ে, উল্টো চাঁদা চেয়ে না পেয়ে পুলিশে তুলে দিচ্ছে মব সন্ত্রাসীরা।

চাঁদাবাজদের হাতে জিম্মি এসব লোকজন চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে হত্যা মামলা বা অনুরূপ আইনি ঝামেলায় জড়ানো হচ্ছে তাদেরকে। গত বছরের ৫ই আগস্টের পর থেকে এসব ঘটনার সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা এ নিয়ে নিন্দা ও বিবৃতি দিলেও ইউনূস সরকার এসব ঘটনায় কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে পারেনি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা উল্টো প্রাশাসনিক এবং পুলিশি হয়রানির মুখে পড়ে জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন।

এস এস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু সাদেকের বিরুদ্ধে এমনই এক হয়রানিমূলক মামলার ঘটনা উঠে এসেছে।

ব্যবসায়িক পাওনা ৬ কোটি টাকা পরিশোধ না করে দেনাদারই উল্টো তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা করেছেন বলে অভিযোগ আছে। মামলার এজাহারে সাদেককে ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

২রা ফেব্রুয়ারি রাত ১২টার দিকে মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ ছিল তিনি চাঁদা আদায়ের চেষ্টা করেছিলেন এবং ‘ডিবি হারুন সিন্ডিকেট’-এর সদস্য। তবে রাষ্টপক্ষ কিংবা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা প্রাথমিকভাবে কোনো অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেননি। তিন দিনের মধ্যেই আদালত তাকে জামিন দেন। মামলাটি করেন ব্যবসায়ী জুলফিকার মল্লিক, যিনি চলতি বছরের ২৫শে জানুয়ারি ঢাকার আদালতে এজাহার দাখিল করেন।

মামলার এজাহারে দাবি করা হয়, ২০২৩ সালে তিন দফায় তাকে ডিবি অফিসে নিয়ে ভয়ভীতি দেখানো হয় এবং ৬ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়।

অথচ ডিবি কার্যালয়ের লগবুক পর্যালোচনায় দেখা যায় ১৩ ও ১৪ই ফেব্রুয়ারি ‘জুলফিকার মল্লিক’ নামে কোনো প্রবেশের নথি নেই। একইভাবে, ২১শে ফেব্রুয়ারির কথিত ঘটনার দিনও লগবুকে তার প্রবেশের রেকর্ড পাওয়া যায়নি।

আরও জানা যায়, ওইদিন ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ নিজ কার্যালয়েই ছিলেন না; তিনি কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের এক অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এসব তথ্য যাচাই করে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ৬ কোটি টাকার পাওনা পরিশোধ এড়াতেই মামলাটি করা হয়েছিল।

গত ১৯শে মে রাতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গ্রন্থাবলীর প্রকাশনা সংস্থা হাক্কানী পাবলিশার্সের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফার বাসা ঘেরাও করে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর কয়েকজন কর্মী। তাকে ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে মব সৃষ্টি করা হয় এবং বাসায় হামলা ও লুটপাটের চেষ্টা করা হয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ৯৯৯-এ ফোন করলে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

এ সময় পুলিশের সঙ্গে উপস্থিত কয়েকজনের বাগবিতণ্ডা হয় এবং কয়েকজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে এনসিপি নেতা হান্নান মাসউদ চাঁদাবাজ চক্রের মূল হোতাকে থানা থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন।

২৮শে সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ‘সেফ হাসপাতাল’-এ সদ্য মৃত এক নবজাতকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরেকটি চাঁদাবাজির অভিযোগ আসে। কয়েকজন সমন্বয়ক পরিচয়ে হাসপাতালের মালিক শিল্পী আক্তারের কাছে চাঁদা দাবি করে এবং চাপ সৃষ্টি করে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে তিনি সেনাবাহিনীকে ফোন করেন। সেনাসদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে চারজনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পরে শিল্পী আক্তার থানায় মামলা করেন।

এভাবে বিভিন্ন জায়গায় ‘ফ্যাসিস্টদের দোসর’ তকমা ব্যবহার করে ভীতি সৃষ্টি করে চাঁদা আদায় চলছে প্রকাশ্যে। সারাদেশের গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত সর্বত্র বিভিন্ন পেশাজীবীদের জিম্মি করে চাঁদাবাজি করছে এনসিপি, জামায়াত-শিবির, বিএনপি, গণঅধিকার পরিষদসহ ইউনূস সরকারের ঘনিষ্ট নানা রাজনৈতিক ও প্রেশার সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী। কিন্তু এসব ঘটনায় রয়ে যাচ্ছে মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে।

Visited 12 times, 1 visit(s) today