নিজস্ব প্রতিবেদক
ব্রিটিশ এমপি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত জালিয়াতির মামলার বিচার প্রক্রিয়াকে ‘সাজানো ও পক্ষপাতদুষ্ট’ বলেছেন ব্রিটিশ পাঁচ প্রভাবশালী আইনজীবী।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের যুক্তরাজ্যস্থিত রাষ্ট্রদূত আবিদা ইসলামকে চিঠি দিয়েছেন তারা।
আইনজীবীদের মধ্যে রয়েছেন– যুক্তরাজ্যের সাবেক বিচারমন্ত্রী ও বরিস জনসনের মেয়াদের প্রভাবশালী কনজারভেটিভ নেতা রবার্ট বাকল্যান্ড, সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের স্ত্রী ও খ্যাতনামা ব্যারিস্টার শেরি ব্লেয়ার, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ডমিনিক গ্রিভ, আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ফিলিপ স্যান্ডস এবং মানবাধিকার আইনজীবী জিওফ্রি রবার্টসন।
চিঠিতে তারা বলেছেন, সাবেক প্রতিমন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিক এই মামলা লড়ার ন্যূনতম অধিকারও পাননি; অভিযোগ সম্পর্কে যথাযথ ধারণা বা আইনজীবীর নিয়োগের সুযোগ কোনোটিই দেওয়া হয়নি তাকে।
গত বছরের ৫ই আগস্ট বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাতের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্নি ও লন্ডনের হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেটের আসনের লেবার এমপি টিউলিপ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হন। রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পে দুর্নীতির কথিত অভিযোগসহ একাধিক বিষয়ে টিউলিপের নাম জুড়ে দেওয়া হয়। যে বিষয়টি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে আলোড়ন তোলে।
পরে টিউলিপ ও তার বোনের ফ্ল্যাট নিয়েও আলোচনা শুরু হয়। ৭ লাখ পাউন্ড মূল্যের লন্ডনের সেই ফ্ল্যাট ‘উপহার থেকে প্রাপ্ত’–এমন দাবির মধ্যে নিরপক্ষে তদন্তের স্বার্থে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সিটি মিনিস্টার পদ থেকে ইস্তফা দেন টিউলিপ। যার প্রেক্ষিতে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার তার সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে বলেন— টিউলিপের জন্য “দরজা খোলা” থাকবে।
ব্রিটিশ নৈতিকতা উপদেষ্টা স্যার লরি ম্যাগনাস নিরপেক্ষ তদন্তের পর টিউলিপকে নির্দোষ আখ্যা দিয়ে সমস্ত অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেন; তিনি আরও মন্তব্য করেন— টিউলিপ যদি বাংলাদেশে তার পরিবারের রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণেই এমন বিপাকে পড়েছেন।
চিঠিতে যা উঠে এসেছে
চিঠিতে বলা হয়েছে, সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও হ্যাম্পস্টেড-অ্যান্ড-হাইগেটের লেবার এমপি টিউলিপ সিদ্দিক অভিযোগ সম্পর্কে যথাযথ ধারণা, আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ— কোনোটিই পাননি।
একই মামলায় টিউলিপ সিদ্দিকের সঙ্গে অভিযুক্ত তার মা শেখ রেহানা ও খালা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও ‘পলাতক’ দেখিয়ে বিচার কার্যক্রম চলছে। পলাতক দেখানোয় তাদের পক্ষে কোনো আইনজীবী আদালতে লড়তে পারেননি, লড়তে দেওয়া হয়নি। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলায় তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি, অর্থাৎ আজীবন কারাদণ্ড চেয়েছে।
টিউলিপ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, মামলাটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তার ঘনিষ্ঠ একজন জানান, “এটি ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার মামলা। এমনকি তার নিজের দলের বাইরের খ্যাতিমান রাজনীতিবিদরাও এ বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। ড. ইউনূসের জন্যও বিষয়টি লজ্জাজনক।”
চিঠিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে যাকে টিউলিপ নিজের পক্ষের আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ দিতে চেয়েছিলেন, তাকে দায়িত্ব ছাড়তে বাধ্য করা হয়, গৃহবন্দি রাখা হয় এবং তার মেয়েকে হুমকি দেওয়া হয়।
আইনজীবীরা লিখেছেন, “এই বিচার প্রক্রিয়া সাজানো এবং পক্ষপাতদুষ্ট উপায়ে মামলা পরিচালনার উদাহরণ।”
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, টিউলিপ তার খালা শেখ হাসিনাকে ‘প্রভাবিত’ করে ঢাকার পূর্বাচলে তার মায়ের জন্য একটি প্লট বরাদ্দ করিয়েছিলেন। টিউলিপ এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন— এসব দাবি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
চিঠিতে তারা উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের কথা বললেও বাস্তবে বাংলাদেশে বিরোধীরা নিরপেক্ষ বিচার পাচ্ছেন না— এমন অভিযোগ বাড়ছে।
আইনজীবীদের মন্তব্য অনুযায়ী, টিউলিপ যুক্তরাজ্যের নাগরিক এবং নির্বাচিত এমপি; তার সঙ্গে যোগাযোগ করা বা আদালতে হাজির করা সম্ভব। সে হিসেবে তাকে ‘পলাতক’ দেখানোর যুক্তি আদালতে টিকবে না।
চিঠিতে আরও বলা হয়— টিউলিপ সিদ্দিককে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেখানো হয়নি, প্রমাণ দেখানো হয়নি, কোন আইনজীবী নিয়োগ দিতে দেওয়া হচ্ছে না ও অনুপস্থিতিতেই বিচার চলছে যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও বিচারিক মানদণ্ডের পরিপন্থী।
তাদের দাবি— “অযৌক্তিকভাবে অনুপস্থিতিতে বিচার পরিচালনা করা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পুরোপুরি লঙ্ঘন করছে।”
প্লট জালিয়াতির মামলায় রায়ের তারিখ ধার্য হয়েছে ১লা ডিসেম্বর। শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও টিউলিপ— তিনজনই ‘পলাতক’ দেখানো হওয়ায় বিচার চলছে একতরফাভাবে। এ ধরনের বিচার প্রক্রিয়া অবিলম্বে সংশোধন করে ন্যায়সংগত বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের পাঁচ বিশিষ্ট আইনজীবী।
চিঠিতে আরো বলা হয়, “অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিচারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের যে অভিযোগ উঠছে, তার সঙ্গে এটি পুরোপুরি মিলে যায়।”
ব্রিটিশ আইনজীবীরা বলেছেন, প্লট দুর্নীতির ওই মামলার বাদী ও তদন্তের দায়িত্বে থাকা দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তারা টিউলিপের দায়-দায়িত্ব নিয়ে গণমাধ্যমে বারবার মন্তব্য করছেন, ড. ইউনূসও এ বিষয়ে মন্তব্য করে আসছেন।
“ক্ষমতাসীনদের এ ধরনের বক্তব্য–যেখানে সিদ্দিককে অপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত করা হচ্ছে–এটা কীভাবে নিরপেক্ষ ও হস্তক্ষেপমুক্ত বিচার নিশ্চিত করবে আমরা তা বুঝতে পারছি না।”
