‘রিসেট বাটন’ চেপে অতীত মোছার দায়িত্ব নিয়ে অন্তিম সময়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ফেরার চেষ্টা? ড. ইউনূসের স্টান্টবাজি?

‘রিসেট বাটন’ চেপে অতীত মোছার দায়িত্ব নিয়ে অন্তিম সময়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ফেরার চেষ্টা? ড. ইউনূসের স্টান্টবাজি?
শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক

সশস্ত্রবাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস ঘোষণা করলেন তিনি “মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্নের রাষ্ট্র গঠনে অঙ্গীকারবদ্ধ”। যদিও ইতিপূর্বে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নগুলোকে ধ্বংস করার হিংস্রতা ও অরাজকতাকে “নতুন পথ” আখ্যা দিয়ে বলেছিলেন তিনি, “ছাত্ররা নতুন পথ বেছে নিয়েছে, অতীতের সব কিছু নাই হয়ে গেছে, ছাত্ররা রিসেট বাটন চেপে দিয়েছে”।

কিন্তু দায়িত্বপালনের অন্তিম সময় যখন সমাগত, নির্বাচনের তিন মাস বাকি—তখন এই অঙ্গীকার কি শুধুমাত্র মার্কেটিং গিমিক, নাকি বাস্তবে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্নের সঙ্গে সংঘাতময় বাস্তবতার দায় মোচনের চেষ্টা? এই প্রশ্ন আজ জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসে পড়েছে।

পড়ুন: জুলাই দাঙ্গাবাজদের ভাস্কর্য-শিল্পকর্ম লুট: শিল্প-সংস্কৃতি বিরোধী আগ্রাসনে রাষ্ট্রীয় মদদ, মূল্যবান চিত্রকর্ম লাপাত্তা

প্রশ্নটা উঠেছে এমন সময়, যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সুতিকাগার হিসেবে পরিচিত জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িসহ সারাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ৩ হাজারের অধিক স্মারক, ভাস্কর্য, ম্যুরাল ধ্বংস করে দিয়েছে ড. ইউনূসের সমর্থক শিক্ষার্থী নামক উগ্রবাদীরা।

সশস্ত্রবাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে ঢাকা সেনানিবাসে বক্তৃতা দিয়ে ড. ইউনূস বলেন, “আমি প্রতিজ্ঞা করছি, মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্নের সেই রাষ্ট্রকে বাস্তবে রূপায়িত করব, যেখানে বৈষম্য ও নিপীড়নের অস্তিত্ব থাকবে না, স্বাধীনতা ও কল্যাণের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে।”

তিনি আরও বলেন, “এখন থেকে জনগণই ক্ষমতার একমাত্র উৎস হবে, এবং বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে মানবিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে প্রশংসিত হবে।”

পড়ুন: জুলাই চেতনার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ, থাকছে না ১৬ ডিসেম্বরে পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের ভাস্কর্য: উপদেষ্টা

এই বক্তব্যে তিনি মুক্তিযুদ্ধের শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং সশস্ত্রবাহিনীর ভূমিকাকে উল্লেখ করে বলেন, তারা সর্বদা জাতির পাশে দাঁড়িয়েছে।

কিন্তু এই অঙ্গীকারের প্রেক্ষাপটে জনগণের মনে জেগেছে সেই প্রশ্ন, যা ড. ইউনূসকে করা হয়েছিল মাস দশেক আগে: “ছাত্ররা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত সকল স্থাপনা, ভাস্কর্য, ম্যুরাল ধ্বংস করছে, ধানমন্ডি ৩২-এর ঐতিহাসিক বাড়ি-জাদুঘরটি ধ্বংস করেছে—এই অরাজকতা কীভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্নের সঙ্গে যুক্ত?”

তখন তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “ছাত্ররা নতুন পথ বেছে নিয়েছে, অতীতের সব কিছু নাই হয়ে গেছে।” এই বক্তব্যে তিনি ছাত্রদের অরাজকতাকে ‘রিসেট বাটন’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, যা মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস এবং ঐতিহ্যকে অস্বীকার করার মতোই ছিল।

গত বছরের ৫ই আগস্ট প্রথম দফা অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের পর দ্বিতীয় দফায় এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি তথা জাদুঘরটি বুলডোজার দিয়ে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিয়েছিল ড. ইউনূসের সমর্থক শিক্ষার্থী নামক উগ্রবাদী জঙ্গিরা। যেখানে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক চিহ্ন, বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবার এবং চার জাতীয় নেতার স্মৃতি সংরক্ষিত ছিল। যার কিছুই রক্ষা পায়নি।

পড়ুন: ৫ আগস্টের পর ৯ দিনে ভাস্কর্য ভাঙা হয়েছে দুই হাজারের বেশি

এছাড়াও দেশব্যাপী বঙ্গবন্ধু, জাতীয় নেতৃবৃন্দ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাষ্কর্য ভাঙা, মুক্তিযুদ্ধের স্মারকগুলো ধ্বংস এবং মুজিবনগরসহ সকল স্থাপনা, স্মৃতিচিহ্ন, স্বাধীনতা জাদুঘরগুলোও হামলা, লুটপাট ও সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছে —এসব ঘটনা তারাই ঘটিয়েছিল, যারা জুলাই-আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার উৎখাতে নেতৃত্ব দিয়েছিল। দেশকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।

এখন প্রশ্ন উঠছে: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, চার জাতীয় নেতাসহ মুক্তিযুদ্ধের সকল স্মারক ও স্থাপনা ধ্বংস করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অস্বীকার করার পর কীভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন বাস্তবায়িত করবেন ড. ইউনূস? মুক্তিযুদ্ধের সেই স্বপ্ন যা ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সাম্যতা ও স্বাধীনতার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল, তা কি ধ্বংসের নামে ‘রিসেট’ করে নতুন করে গড়া যায়? নাকি তিনি নিজে মুক্তিযুদ্ধের নতুন ইতিহাস রচনা করতে যাচ্ছেন, যেখানে আজ তিনি নিজেই জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করে এক পরিকল্পিত মিথ্যাচারকে নতুন করে সামনে আনলেন।

এদিকে, মুক্তিসংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ ড. ইউনূসের বক্তব্যকে “ঐতিহাসিক অস্বীকৃতি” বলে সমালোচনা করেছেন।

একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস করে কোনো নতুন রাষ্ট্র গড়া যায় না; এটি জাতির মূলকে কেটে ফেলার চেষ্টা।”

পড়ুন: মাতৃভাষা দিবসের রূপকারের ম্যুরাল ভাঙচুর, মুক্তিযোদ্ধা হওয়াই অপরাধ কি না, প্রশ্ন জনগণের

ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বপালন যখন অন্তিম সময়ে, নির্বাচনের তিন মাস বাকি থাকতে এই অঙ্গীকার কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। এটা কি শুধুই দায়মোচনের চেষ্টা নাকি মনভোলানো কথা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। জুলাই দাঙ্গায় নেতৃত্বদানকারী ছাত্ররা যদি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে ‘অতীতের ধুলো’ বলে ফেলে দেয়, তাহলে কোন স্বপ্নের রাষ্ট্র গড়বে এরা?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধ্বংসাত্মক অস্বীকৃতি জাতীয় ঐক্যকে বিভক্ত করবে এবং নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসবিমুখ করবে।

Visited 73 times, 1 visit(s) today