মতামত || কেন আমি আওয়ামী লীগের ডাকা “শাট ডাউন” কর্মসূচি সমর্থন করি?

মতামত || কেন আমি আওয়ামী লীগের ডাকা “শাট ডাউন” কর্মসূচি সমর্থন করি?
শেয়ার করুন
মৃণ্ময় সেন

বাঙালি জাতির ইতিহাস এক অবিরাম সংগ্রামের কাহিনী। যতবারই নিপীড়নের কালো ছায়া নেমে এসেছে, যতবারই দুঃশাসনের শৃঙ্খল আমাদের গলায় পরানো হয়েছে, ততবারই আমরা রাস্তায় নেমেছি, প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়েছি এবং জনগণের সমর্থনে সবকিছু বন্ধ করে দিয়ে অত্যাচারীদের কাছে মাথা নত করতে অস্বীকার করেছি। এটি আমাদের রক্তে মিশে থাকা প্রতিরোধের চেতনা।

আজ, ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে যে অরাজকতা, অর্থনৈতিক ধস, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং বিচারের নামে প্রহসন চলছে, তা ঠিক সেই একই প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে যা অতীতে বাঙালিকে বিদ্রোহী বানিয়েছে।

আওয়ামী লীগের ডাকা ১৬ ও ১৭ই নভেম্বরের সারাদেশব্যাপী “শাট ডাউন” এর পক্ষে আমি দাঁড়াবো, কারণ এটি কোনো দলীয় কর্মসূচি নয়—এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে বাঙালির মৌলিক চরিত্রের প্রতিফলন।

বাঙালির প্রতিবাদী চরিত্রের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

বাঙালির প্রতিরোধের ইতিহাস শুরু হয় ১৯৫২-এর ভাষার জন্য আন্দোলন থেকে, যা ছয় দফা হয়ে ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এসে পৌছায়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক দমনের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা রাস্তায় নেমে আসে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার, আইয়ুব খানের পতন—এ সবই ছিল জনগণের শাটডাউন-সদৃশ অসহযোগের ফল।

এরপর ১৯৭১-এর অসহযোগ আন্দোলনে সাড়া দিয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পুরো বাংলাদেশ অচল করে দিয়ে বাঙালি স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করে। দোকান-পাট বন্ধ, যানবাহন থামিয়ে, ঘরে অবস্থান করে জনমানুষ প্রতিবাদে শরিক হয়। এটি ছিল নিপীড়িতের প্রতিরোধের চূড়ান্ত রূপ।

১৯৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও একই দৃশ্য। এরশাদের দুঃশাসন, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে ছাত্র-শ্রমিক-রাজনৈতিক দলগুলো রাস্তায় নেমে হরতাল-অবরোধ ডাকে। জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিয়ে সবকিছু বন্ধ করে সমর্থন যোগায়, যার ফলে স্বৈরশাসকের পতন ঘটে।

সাম্প্রতিককালে ২০১৮-এর নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং ২০২৪-এর কোটা সংস্কার আন্দোলনও কিছু অসন্তোষকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নামার ঘটনাও আরেকটি উদাহরণ। এ সব আন্দোলনের মূলে ছিল একটি সাধারণ সূত্র- দুঃশাসন, নিপীড়ন এবং অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক অবিচারের বিরুদ্ধে অটুট প্রতিরোধ।

অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে একই অন্যায়, অনাচার, দুঃশাসন এর পুনরাবৃত্তি ঘটছে। আজকের পরিস্থিতি ঠিক সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের পুনরাবৃত্তি। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে: মুদ্রাস্ফীতি আকাশছোঁয়া, বেকারত্ব বেড়েছে, রিজার্ভ কমেছে, ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির।

এর সাথে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণার ষড়যন্ত্র, হাজার হাজার নেতাকর্মীর হত্যা, মব লিঞ্চিং, গ্রেপ্তার এবং প্রহসনের ক্যাঙ্গারু কোর্ট সবই আইয়ুব খানের পথ ধরেই যেন ঘটে চলেছে।

বিতর্কিত বিচারক ও পক্ষপাতদুষ্ট আইনজীবীদের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশ্বে সবচেয়ে বেশী সময়, ২১ বছর ধরে নারী রাষ্ট্রপ্রধান থাকা শেখ হাসিনাকে পূর্বনির্ধারিত সাজা দিয়ে দলকে নিষ্ক্রিয় করার চক্রান্ত চলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের রায় ঘোষণা (১৬-১৭ নভেম্বর) এরই অংশ। এটি কোনো ন্যায়বিচার নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নিধনের হাতিয়ার।

মব লিঞ্চিংয়ে নিরীহ মানুষ খুন হচ্ছে, গ্রেপ্তারের নামে অপহরণ, বিচারের নামে প্রতিশোধ। এই টানাপোড়েন ১৯৬৯-এর দমন, ১৯৯০-এর স্বৈরাচার শাসনের মতই।

১৩ই নভেম্বরের “ঢাকা লকডাউন” এর সাফল্য দেখিয়েছে যে, জনগণ এখনো প্রতিবাদী। এখন সময় এসেছে সারাদেশকে অচল করে দিয়ে এই দুঃশাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর।

কেন “শাট ডাউন” এর পক্ষে দাঁড়াবো?

আমি আওয়ামী লীগের ডাকা “শাট ডাউন” এর পক্ষে দাঁড়াবো কারণ এটি দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বাঙালির মৌলিক চরিত্রের প্রতিফলন। যে কোনো অন্যায়—সেটা অর্থনৈতিক ধ্বস হোক, রাজনৈতিক হত্যা হোক বা বিচারের প্রহসন—প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ ছাড়া মেনে নেওয়া যায় না। এটি আমাদের ডিএনএ-তে লেখা।

ঘরে বসে, দোকান বন্ধ করে, রাস্তা অচল করে আমরা বলব: “আর নয়!”

এটি কোনো সহিংসতা নয়, বরং অহিংস প্রতিরোধের শক্তিশালী অস্ত্র, যা অতীতে স্বৈরশাসকদের হাঁটু গেড়ে বসিয়েছে।

বাঙালি কখনো নিপীড়ন মেনে নেয়নি। আজও নেবে না। ১৬-১৭ নভেম্বরের “শাট ডাউন” এ অংশ নিয়ে আমরা প্রমাণ করব যে, সেই প্রতিবাদী বাঙালি জাতি, দুর্দমনীয় বাঙালি জাতি, যাদের আলেকজেন্ডার দ্যা গ্রেটও জয় করতে পারেনি।

এটি আওয়ামী লীগের একার লড়াই নয়—এটি প্রতিটি নিপীড়িত বাঙালির লড়াই।

জয় হোক প্রতিরোধের, জয় হোক বাঙালির!

Visited 55 times, 1 visit(s) today