মতামত || চার দশকের জামায়াত-নির্ভরতার মূল্য দিচ্ছে বিএনপি

মতামত || চার দশকের জামায়াত-নির্ভরতার মূল্য দিচ্ছে বিএনপি
শেয়ার করুন

এজাজ মামুন

জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের একটি বিতর্কিত রাজনৈতিক দল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দলটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে এবং পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী গঠনে নেতৃত্ব দিয়েছে, যারা গণহত্যা, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের উপর অত্যাচার, নির্যাতন ও বুদ্ধিজীবী হত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ছিল।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করে, ফলে জামায়াতও নিষিদ্ধ হয়। এরপর ১৯৭৩ সালের ২১শে এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধ ও মানবতাবিরোধী অভিযুক্ত জামায়াতের আমির গোলাম আযমসহ ৩৯ জন নেতার নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়। অনেক নেতা আত্মগোপনে বা বিদেশে পালিয়ে গেলেও জামায়াত গোপনে সংগঠিত হতে থাকে।

পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পরে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর পুনরাগমন সম্ভব হয়। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তিগুলো ও বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসনের জিয়াউর রহমানের নীতির কারণে ১৯৭৯ সালে গোলাম আযমের নেতৃত্বে “জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ” নামে দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে ফিরে আসে।

এরপর থেকেই শুরু হয় জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াতে ইসলামীর সখ্যতা ও যুগপৎ পথচলা।

বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি দক্ষিণপন্থী প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠে। কিন্তু আজ দলটি রাজনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত, সাংগঠনিকভাবে ভঙ্গুর এবং আদর্শিকভাবে দিকহীন। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে জামায়াত-নির্ভর রাজনীতি বিএনপির এই পতন এবং জনগণের আস্থাহীনতার অন্যতম কারণ।

এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও বিএনপি জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে সরকার গঠন করে। এটি ছিল যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত একটি দলের রাজনৈতিক পুনর্বাসন। সেই সময় এই সিদ্ধান্তকে বিএনপি “কৌশল” হিসেবে দেখলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি বিএনপির জন্য আত্মঘাতী হয়ে ওঠে।

জামায়াতে ইসলামীকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং পরবর্তীতে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে তাদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দেওয়া বিএনপির নৈতিক অবস্থানকে গভীরভাবে দুর্বল করে তোলে। সেই সময় থেকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে বিএনপির দলীয় অবস্থান অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।

একদিকে বিএনপি গণতন্ত্র ও উন্নয়নের কথা বললেও, অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্তদের পাশে দাঁড়ানো তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু করে তোলে। ফলে দলের আদর্শিক দিকনির্দেশনা ও জাতীয় মূল্যবোধের প্রতি প্রতিশ্রুতি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।

২০০১–২০০৬ সালে জামায়াতকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও মন্ত্রণালয় দেওয়ায় প্রশাসন ও শিক্ষায় মুক্তিযুদ্ধের চেতানা বিরোধী আদর্শের প্রভাব বিস্তার পায়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি ও ধর্মীয় রাজনৈতিকীকরণে বিএনপি জামায়াতের কর্মকাণ্ডে নীরব সমর্থন জানায়, ফলে বিএনপি নাগরিক সমাজের বড় অংশ ও আন্তর্জাতিক মহলের আস্থা হারায়।

জামায়াতে ইসলামীর সংগে বিএনপির মধুর মাখামাখির কারণে দলটির উপর সহিংসতা ও সন্ত্রাসের রাজনীতির দায় এসে পড়ে। ২০০৫ সালের আগস্টে জামায়াত-ঘনিষ্ঠ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির দেশব্যাপী বোমা হামলার ঘটনায় বিএনপি সরকারের নীরব ভূমিকা ও দ্বিচারিতা আন্তর্জাতিক মহলে বিএনপির প্রতি নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করে। তারা বাংলাদেশকে ‘জঙ্গি-সহনশীল’ হিসেবে দেখতে শুরু করে। মৌলবাদী শক্তিকে রাজনৈতিকভাবে আশ্রয় দেওয়া যে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার জন্য বিপজ্জনক তা দলটি বুঝতে পারেনি।

২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে দেশের তরুণ প্রজন্ম সোচ্চার হলে বিএনপি কোনো অবস্থান নেয়নি। বরং, জামায়াতের সহিংস প্রতিক্রিয়া ও অগ্নিসন্ত্রাসের সময় দলটি নীরব থেকেছে অথবা জামায়াতকে সহযোগিতা করেছে। বিএনপির এই ভুমিকার কারণে তরুণদের কাছে দলটি “অসাম্প্রদায়িকতার শত্রু” হিসেবে বিবেচিত হয়। যুদ্ধাপরাধীর বিচারের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি জামায়াতে ইসলামীর পথে চলে সাধারণ জনগণের আস্থা হারায়।

গত বছর জুলাই আন্দোলনেও বিএনপি-জামায়াত একই পথে চলে। গতবছর আগস্ট থেকে আওয়ামী লীগ, ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শের জনগণ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও সাধারণ মানুষদের উপর বিএনপি ও জামায়াত হত্যা, মব সন্ত্রাস, জুলুম ও অত্যাচার চালিয়ে আসছে।

জামায়াতকে সাথী করে নিয়ে বিএনপি চার দশক পথ চললেও হঠাত করেই দল দুটির মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে গণভোটের সময় ও পদ্ধতি নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে তীব্র মতভেদ সৃষ্টি হয়। বিএনপি চায় নির্বাচনের দিনেই গণভোট হোক, আর জামায়াত চাইছে আলাদা গণভোট। এর সঙ্গে প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (PR) পদ্ধতি নিয়েও বিরোধ এখন তুঙ্গে।

এসব ইস্যুতে ঐতিহ্যগত মিত্র দুই দলের সম্পর্ক টানাপোড়েনের মুখে। এর প্রধান কারণ জামায়াত বিএনপির সহযোগিতায় তাদের রাজনীতি গুছিয়ে নিয়েছে আর বিএনপির অন্তঃসারশূন্য রাজনীতিটা বুঝে গেছে।

জামায়াতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বিএনপিকে নিজের দলের নেতা কর্মীদের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিরোধী উপদলে বিভক্ত করেছে। দলটির নেতৃত্বের মধ্যে যে শূন্যতা রয়েছে তা দলটির দিকহীন অবস্থান, নেতাদের বক্তৃতা- বিবৃতি থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়।

চার দশকের জামায়াত-নির্ভরতার ফল হিসেবে বিএনপি রাজনৈতিক ভিত্তি, গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি ও আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। আজ তারা এমন এক দোদুল্যমান অবস্থায় আটকে আছে যে একদিকে জামায়াত ছাড়া তাদের টিকে থাকা কঠিন, অপরদিকে জামায়াতের সঙ্গে যুগলবন্দী পথচলায় তাদের প্রতি দেশের মানুষ ও নেতা কর্মীদের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়।

এমন অবস্থায় বিএনপি কি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রভাবমুক্ত, উদার ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির পথে ফিরে আসতে পারবে, না কি হারিয়ে যাবে দেশের রাজনীতি থেকে?

Visited 28 times, 1 visit(s) today