জুলাই দাঙ্গাবাজদের ভাস্কর্য-শিল্পকর্ম লুট: শিল্প-সংস্কৃতি বিরোধী আগ্রাসনে রাষ্ট্রীয় মদদ, মূল্যবান চিত্রকর্ম লাপাত্তা

জুলাই দাঙ্গাবাজদের ভাস্কর্য-শিল্পকর্ম লুট: শিল্প-সংস্কৃতি বিরোধী আগ্রাসনে রাষ্ট্রীয় মদদ, মূল্যবান চিত্রকর্ম লাপাত্তা
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের নাম করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র সফল করার পর জুলাই দাঙ্গাবাজদের হাতে শুধু শিল্প-ভাস্কর্য-ঐতিহাসিক স্থাপনা ভাঙচুরই নয়, দেশের প্রথিতযশা শিল্পীদের অসংখ্য দুর্লভ চিত্রকর্ম লুট হয়েছে। গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের স্মৃতি জাদুঘর এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা থেকে লুট হয়েছে এসব মূল্যবান শিল্পকর্ম। এখন পর্যন্ত সেসব শিল্পকর্মের কোনটিরই হদিস মেলেনি। ইউনূস সরকারও এসব উদ্ধারে নীরবতা পালন করছে। বরং লুটপাটে প্রশ্রয় দিয়েছে- এমন অসংখ্য নজির রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারবিরোধী আন্দোলনের পর সমন্বয়করা সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে টার্গেট করেছিল। শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে ওঠা অনেক স্থান ও সংগ্রহশালায় হামলা ছিল উদ্দেশ্যমূলক। তাদের এই অপতৎপরতায় সরকারও নীরব থেকেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবরে জুলাই দাঙ্গাবাজরা গণভবনে ঢুকে পড়ে। আসবাব, নান্দনিক পণ্য, সংগ্রহের সামগ্রীসহ মূল্যবান অনেক চিত্রকর্ম লুট হয় তখন। একই সময়, মন্ত্রী-সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতৃবৃন্দের বাড়িঘরে চালানো হয় লুটপাট। সেখান থেকে চিত্রকর্ম, ভাস্কর্যসহ অগুণিত শিল্পকর্ম লুটপাট করা হয়। বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে এসব লুটপাটে অংশ নিয়েছেন দেশবরেণ্য সাবেক ফুটবল খেলোয়াড় ও তাদের পরিবারবর্গ, চিকিৎসকসহ সমাজের প্রতিষ্ঠিত লোকজনও। শিল্পকর্ম ছাড়াও লুটপাট হয় নগদ অর্থ, সোনাদানা ও মূল্যবান জিনিসপত্র।

শিল্পপতি সালমান এফ রহমানের গুলশানের বাড়িতে বহু বছর ধরে গড়ে ওঠা বিরল চিত্রকর্মের সংগ্রহশালা ছিল। স্থানীয়রা জানান, আন্দোলনকারীরা সেসময় এসব লুটপাট করেন। আশপাশের অন্য ধনীব্যক্তিদের ঘরে ঢুকেও শিল্পকর্ম, মূল্যবান জিনিসপত্র, ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস নিয়ে যান। কেউ কেউ রাস্তার পাশে টোকাইদের কাছ থেকেও সস্তায় এসব দুর্লভ শিল্পকর্ম কিনে নেন।

বিভিন্ন সূত্র জানায়, লুট হওয়া শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে ছিল দেশের কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী কামরুল হাসান, এসএম সুলতান, মোহাম্মদ কিবরিয়া, কাইয়ুম চৌধুরী, রফিকুন নবী, শহিদ কবির, শাহাবুদ্দিন আহমেদ, রশিদ চৌধুরী, মুর্তজা বশীর এবং কনকচাঁপা চাকমার অসংখ্য চিত্রকর্ম। এসব শিল্পকর্ম শুধু মূল্যবান নয়, এগুলো বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়েরও অংশ। কামরুল হাসানের রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্র কিংবা সুলতানের কৃষক-প্রধান ক্যানভাসগুলো এই ভূখ-ের আত্মপরিচয় বহন করে।

জুলাই দাঙ্গার সময় এবং পরবর্তী কয়েক মাস ধরে সারাদেশেই শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একটি ঘৃণার রাজনীতি ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় বৈছা সমন্বয়করা শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষই নয়, কলা ও সংস্কৃতিকে তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে বাধা ও সংস্কৃতিকর্মীদের নানাভাবে হয়রানি ও মারধরও করে। তাদের বিরুদ্ধে মবও করে।

চারুকলার অধ্যাপক লালা রুখ সেলিম বলেন, শিল্প ও শিল্পীদের প্রতি যে অবজ্ঞা, সেটি ওই সময় স্পষ্ট হয়ে যায়। তাদের আচরণ দেখে মনে হয়েছে শিল্পকর্ম থাকলেই যেন অমঙ্গল। এটাই সবচেয়ে দুঃখজনক।

শিল্পী নাজিয়া আন্দালিব প্রিমা বলেন, আমরা দেখেছি, শিল্পকর্মগুলো কারা নিচ্ছে। ভিডিও ফুটেজেও তারা ধরা পড়েছে। কিন্তু আজও এসব কেউ উদ্ধার করেনি। বরং সরকার ও প্রশাসন এ নিয়ে একপ্রকার চুপ করে রয়েছে।

তেজগাঁও বিভাগের ডিসি ইবনে মিজান জানান, গণভবন থেকে যেসব সামগ্রী ফেরত এসেছে, তার মধ্যে কোনো চিত্রকর্ম নেই।

পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, দুর্লভ চিত্রকর্ম চুরির বিষয়ে আমার জানা নেই। এখন আমাদের অগ্রাধিকার জাতীয় নির্বাচন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের স্মৃতি জাদুঘর থেকেও দুর্লভ চিত্রকর্ম চুরি ও লুট হয়েছে বলে জানা গেছে, যার একটিরও খোঁজ মেলেনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ সমাজবিজ্ঞানী ড. তৌহিদুল হক বলেন, চিত্রকর্ম শুধু আলংকারিক নয়। এগুলো ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক দলিল। এসব নষ্ট বা চুরি হলে তা রাষ্ট্রীয় আইনের লঙ্ঘন। এই দুর্লভ সম্পদ উদ্ধার না করতে পারা সাংস্কৃতিক দেউলিয়াপনার প্রমাণ। এটা স্পষ্ট, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আমাদের রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার নেই।

শিল্পবোদ্ধারা আশঙ্কা করছেন, লুট হওয়া এসব চিত্রকর্ম বিদেশে পাচার হয়ে যেতে পারে। আবার অনেকে গোপনে সংগ্রহে রেখে উচ্চমূল্যে কালোবাজারে বিক্রির অপেক্ষায় রয়েছে। এর পিছনেও সংষ্কৃতিবিরোধী সমন্বয়কদের প্রভাবশালী চক্রও জড়িত থাকার আশঙ্কা করছেন তারা।

কলাকেন্দ্রের পরিচালক ওয়াকিল আহমেদ বলেন, সংগ্রহশালাগুলো লুণ্ঠিত হওয়ার পর সরকারের কোনো পদক্ষেপ আমরা দেখিনি। এটা বিস্ময়কর। এগুলো তো ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, জাতির ঐতিহ্য।

শিল্পকর্মের ওপর এই পরিকল্পিত আক্রমণ ছিল মৌলিক সাংস্কৃতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে একটি ঘৃণা-প্রসূত আঘাত বলে মনে করেন শিল্প বোদ্ধারা। রাজনৈতিক অস্থিরতাকে পুঁজি করে যারা ইতিহাস, শিল্প ও সংস্কৃতিকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছে, তারা আজও বিচারের বাইরে। আর রাষ্ট্র এখনও নিশ্চুপ রয়েছে বলে মনে করেন তারা।

Visited 17 times, 1 visit(s) today