বাংলাদেশ: এক নিরুদ্দেশ যাত্রায়

বাংলাদেশ: এক নিরুদ্দেশ যাত্রায়
শেয়ার করুন
-হরিনারায়ণ দাস

নতুন বছর কেমন যাবে বাংলাদেশের- এমন একটা প্রশ্ন যদি কেউ করে বসে, আমি বিপদে পড়ে যাব। কারণ এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আমাকে আরেকটা পাল্টা প্রশ্ন করতে হবে, ২০২৫-এ বাংলাদেশ থাকবে তো? কারণ ইতোমধ্যে বর্তমান সরকারের নিয়োগদাতা বলে স্বীকৃত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘোষণা দিয়েছে ২০২৪-এর শেষ দিন অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর ’৭২-এর সংবিধানের কবর রচনা করা হবে। যদি তাই হয় বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটা আসলেই থাকে কিনা- সে প্রশ্ন এসেই যায়।

যদি সংবিধানকেই কবর দেয়া হয়, তাহলে তো রাষ্ট্রপতি সরকার বিচার ব্যবস্থা কিছুই থাকে না। চাইলে দেশের নাম পাল্টে দেয়া যায়। সরকার আবার আগ বাড়িয়ে ঘোষণা দিয়েছে এ কর্মকাণ্ডে তাদের সমর্থন নেই। ব্যাপারটা একটু ভেবে দেখুন, বিজিপি বলছে ভারতের সংবিধানকে কবর দেওয়া হবে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদী বলছেন এর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। যদি সম্পর্কই না থাকে তাহলে তো মোদীজিরই অস্তিত্ব থাকে না।

বুঝতে পারছেন কী এক হিবিজিবি অবস্থার মধ্যে আছে বাংলাদেশ।

৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে উৎখাত করা হয়। এটাকে আন্দোলনকারীরা জুলাই বিপ্লব বলছে। কিন্তু বিপ্লব বলে তারাই পড়েছে সমস্যায়। কারণ বিপ্লবের আগে একটা ঘোষণা দিতে হয়। সেটা কিন্তু এই তথাকথিত বিপ্লবে ছিল না। বরং এরাই শ্লোগান দিয়েছে: বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই।

আন্দোলনটি মূলত সরকারি চাকরিতে কোটা সংরক্ষণ কমানোর দাবিতে শুরু হয়। একটা সময় সরকার তা মেনে নিলে আন্দোলনকারীদের নেতারা আন্দোলন তুলে নেয়ার ঘোষণাও দেয়। কিন্তু এর মধ্যে সারাদেশে নাশকতা ছড়িয়ে পড়লে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটে। পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় দেশ। সেনাবাহিনীকে নামানো হয় রাজপথে। সেনাবাহিনীর অবস্থানে আশ্বস্ত হয়ে সরকারি দলের লোকজন ও পুলিশ মাঠ থেকে সরে আসে। আর সেনাবাহিনী এ সুযোগে করে দারুণ এক বিশ্বাসঘাতকতা। ফলাফল সরকারের পতন। শেখ হাসিনার পলায়ন।

মেঘ চাইতেই বৃষ্টি। কোটা আন্দোলন হয়ে গেলো বিপ্লব। বিপ্লবীদের পালের গোদা প্রফেসর ইউনুসই স্বীকার করেছেন এটা বিপ্লব টিপ্লব কিছু না, সরকার পতনের মেটিকুলাস প্ল্যান। এমন অবস্থায় বিপ্লবীরা পড়েছে ভাবমূর্তি সংকটে। সংকট আরো ঘনীভূত হতে শুরু করে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে। ২০-২৫ জন তথাকথিত বিপ্লবী রাষ্ট্রপতির অফিস গণভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের জন্য হল্লা করতে শুরু করে। সময় বেধে দেয় ২৪ ঘন্টা। এরা সংখ্যায় কম হলেও এদের পেছনে ছিল সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা। তাই যেখানে ৪ জন মানুষ দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারে না, সেখানেই তারা সেনাবাহিনীর সামনে আঙুল তুলে বক্তৃত্বা দিয়েছে ঘন্টার পর ঘন্টা। সভা হয়েছে। মিছিল হয়েছে। এ সময় দেশের অন্যতম বৃহৎ দল বিএনপি একটা চাল চালে। তারা বলে রাষ্ট্রপতি অপসারণে তাদের সম্মতি নেই। ফলে বাছুরদের লাফালাফি বন্ধ হয়ে যায় ২৪ ঘন্টার মধ্যে।

কিন্তু বিএনপি কেন অক্টোবরে বেঁকে বসল? এ অন্তরালের হিসাব নিকাশটা আগামী বছরের বাংলাদেশের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে দেবে।

বাংলাদেশের ভোটররা মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত। এক ভাগ আওয়ামীলীগকে অন্ধভাবে ভোট দেয়। আরেকভাগ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপিকে। অবশিষ্ট ভাগটি মূলত ভাসমান ভোটার। এর মধ্যে ইসলামী দলগুলোর সামান্য ভোট আছে।

আওয়ামীলীগের পতনের পর বিএনপির উত্থান অনিবার্য। তাই আগস্টে সরকারের পতনের পর বিএনপি পরবর্তী সরকার গঠন করবে তা ধরে নিয়েছিল সবাই। তথাকথিত বিপ্লবীরাও তা জানে। কিন্তু তারা কোনোভাবেই বিএনপিকে ক্ষমতায় আনতে রাজি নয়। কারণ এই সরকার পতনের আন্দোলনে বিএনপির ভূমিকা খুব একটা তাৎপর্যপূর্ণ ছিল না। বরং স্বাধীনতা বিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলো অধিক সক্রিয় ছিল। এদের মধ্যে নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীর নাম উঠে আসছে সবচেয়ে বেশি। তাদের সঙ্গে ছিল জামায়েতে ইসলামি। এদের জনসমর্থন খুব কম হলেও এদের আর্থিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি খুব শক্তিশালী। তারা শেখ হাসিনাকে অনুসরণ করে একটা প্রশাসন নির্ভর বজ্রমুষ্টি সরকার গড়তে চায়।

তাই ক্ষমতায় এসেই এরা বিগত সরকারের প্রভাবশালী আমলাদের চাকরিচ্যুত করে। কাউকে কাউকে চাকরিচ্যুতির পর পর বিনা কারণে গ্রেপ্তার করা হয়। ৪/৫ বছর আগে চাকরিতে অবসরে যাওয়া ইসলামপন্থী আমলাদের এনে আবার চাকরিতে বসানো হয়। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব পদে নিয়োগ পেয়েছেন নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীরের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নাসিমুল গনি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে সেবছরই হিযবুত তাহরীরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। নাসিমুল গনিকে ওএসডি(বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করা হয়। তার চার বছর পরে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। ১১ বছর পর তাকে চাকরিতে এনে এ পদে বসানো হয়।

আবার দুর্নীতি ষড়যন্ত্র বিভিন্ন অপরাধে যারা বছরের পর বছর পদোন্নতি পায়নি, তাদের একমাসে ৩ টি পদোন্নতি দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। সরকারের অন্য বিভাগে কোনো তৎপরতা না থাকলেও প্রশাসনে চলছে ঘন ঘন পদোন্নতি। এতে নিরঙ্কুশভাবে হিযবুত তাহরী ও জামায়েতে ইসলাম লাভবান হচ্ছে। তাদের লোকজনই শীর্ষপদগুলো দখল করে নিচ্ছে। এ নিয়ে প্রশাসনে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। সম্প্রতি জনপ্রশাসন সংস্কারের প্রস্তাব নিয়ে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা ফুঁসে উঠে। এটা মূলত বিএনপিপন্থী কর্মকর্তাদের ‌‘মিউটিনি’। এটা দমনের জন্য সচিবদের বাসভবন ও সচিবালয় আগুন দেয়া হয়েছে। এতে পরের দিন কর্মসূচি বাতিল হয়ে যায়।

অন্যদিকে বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজি টেন্ডারবাজি আর দখলবাজি নিয়ে ব্যস্ত। এতে মাঠে ঘাটে দিন দিন বিএনপির জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করেছে। তাই নির্বাচন হতে যত দেরি হবে বিএনপির জনপ্রিয়তা কমে আসবে। আর হিযবুত আর জামায়াত মিলে প্রশাসনের সহায়তায় এই শূন্য স্থান দখলে ব্যস্ত। তাই বিএনপির থিংক ট্যাংকরা এ নিয়ে খুব চিন্তিত। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের নাম করে যত নির্বাচনকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে, তৃতীয় শক্তির উত্থানের সুযোগ ততই সৃষ্টি হচ্ছে।

কিন্তু এতো কিছুর মধ্যে একটা পাহাড়সম বাধা হয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধ। আওয়ামীলীগ ও বিএনপি মূলত মুক্তিযুদ্ধকে পুঁজি করেই রাজনীতি করে। তাই এই মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারলে সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং গ্রাউন্ড তৈরি করা যায়। মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য গত অর্ধশতক ধরে বিভিন্ন প্রচেষ্টা চলছে। বিভিন্ন ন্যারেটিভ বা বয়ান দাঁড় করানোর চেষ্টা হয়েছে। ৫ আগস্টের ঘটনার পর একে দ্বিতীয় স্বাধীনতা বলে প্রথম স্বাধীনতা অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধকে গুরুত্বহীন করার একটা চেষ্টা চলেছে কিছুদিন ধরে। কিন্তু এতে কাজ হয়নি। এখন মুক্তিযুদ্ধকে আরেকটা দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে। আরেকটা ন্যারেটিভ দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে। ১৬ ডিসেম্বরকে এতো কাল বাঙালির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম দিন হিসেবে গণ্য করা হত। কারণ এই দিনে বাঙালি জাতি প্রথম একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পায়। কিন্তু এখন এটাকে দিল্লি আগ্রাসনের বিজয়ের দিন হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আত্মসমর্পনের চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধি না থাকাকে বারবার সামনে আনা হচ্ছে।

গত দুমাসে ভারতের সঙ্গে আমদানি রপ্তানি কমে এসেছে। বেড়েছে পাকিস্তানের সঙ্গে। স্বাধীনতার পর প্রথম চালু হয়েছে করাচি চট্টগ্রাম নৌ-চলাচল। পাকিস্তানের সেনাপতিরা আসছে বাংলাদেশী সৈনিকদের প্রশিক্ষণ দিতে। পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই বোধহয় প্রথম ঘটনা, পরাজিত দেশের সৈনিকরা আসছে বিজয়ী দেশের সৈনিকদের প্রশিক্ষণ দিতে! এ কিসের আলামত তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এই অদল বদল আসলে দেশকে কোন দিকে নিয়ে যাবে, আমার ধারণা দেশের বর্তমান কর্ণধাররাও জানে না। ২০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন আসার পর দাবার ছক কেমন হবে, সেটাই দেখার। এর মধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে আফগানিস্তানের বিরোধ, এর মধ্যে যদি পাকিস্তান জড়িয়ে পড়ে ইরান ইসরায়েল দ্বন্দ্বে, পাকিস্তান কী এভাবে মনোযোগ দিতে পারবে বাংলাদেশের দিকে? বাংলাদেশে চীন ও রাশিয়ার বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। ৫ আগস্টের পর দেশের শিল্প কারখানাগুলো একের পর এক বন্ধ হতে শুরু করেছে। রপ্তানি আয়ে ধস নেমেছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশী ঋণ পরিশোধে যদি টান পড়ে, চীন রাশিয়া কী ভূমিকা রাখে তা দেখার।

বর্তমান সরকারের যে বহির্চাপ সামলানোর মতো শক্তিমত্তা আছে তা বলা যাবে না। বিএনপিকে বাদ দিলে যে খুচরা খাচরা দল নিয়ে সমন্বয়করা ছোটছুটি করছে তাদের মোট ভোট ৭ শতাংশ হবে না। আওয়ামীলীগ একটা রিজার্ভ ভোট ব্যাংকের জোরে গত ১৫ বছর টিকে ছিল। তার উপর ছিল মোটামুটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নতি। কিন্তু এসবের কিছুই নেই এখন। তাই বর্তমান সরকার কীভাবে সামনের দিনগুলোতে দেশ চালায় তাই দেখার।

 

[লেখক পরিচিতিঃ কলামিস্ট]

Visited 8 times, 1 visit(s) today