নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং ও বিভিন্ন সংবাদপত্রে বাংলাদেশের অর্থনীতির রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্সের উল্লেখযোগ্য প্রবাহ নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা হলেও, অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে উঠে এসেছে অর্থনীতির গভীর সংকটের চিত্র।
তিনি সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়নের অভাবকে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই বক্তব্যের আলোকে বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি এবং চ্যালেঞ্জগুলোর একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।
অর্থায়নের সংকট: সামাজিক নিরাপত্তা ও অগ্রাধিকার খাতে ঘাটতি
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, সরকারের আয়ের তুলনায় ব্যয়ের চাহিদা অনেক বেশি, যা সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অর্থায়নের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা বলি, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো দরকার, শিক্ষার কথা বলি। কিন্তু টাকা কোথায়?”
এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয় যে, সরকারের সীমিত রাজস্ব আয় গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, যেমন দারিদ্র্য বিমোচন, বয়স্ক ভাতা বা প্রতিবন্ধী ভাতার মতো প্রকল্পগুলো পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এই ঘাটতি দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাধা সৃষ্টি করছে।
অথচ আওয়ামী লীগ সরকার তাদের শাসনামলে (২০০৯-২০২৪) সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছিল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৩৮টি ভাতা কর্মসূচির মাধ্যমে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তির মতো বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করা হতো।
এছাড়া, ভিজিএফ (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) কর্মসূচির আওতায় প্রায় ১ কোটি দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ন্যায্যমূল্যে চাল, গম ও অন্যান্য নিত্যপণ্য সরবরাহ করা হতো। এই কর্মসূচিগুলো দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এই কর্মসূচির ফলে বাংলাদেশের দারিদ্র্য হার ৩১.৫% থেকে কমে ১৪.৮% এ নেমে আসে।
নিম্ন ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত: রাজস্ব আয়ের দুর্বলতা
ড. সালেহ উদ্দিন তার বক্তব্যে বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাতের দুর্বলতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
তিনি বলেন, “আমাদের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও মাত্র ৭.২ শতাংশ, যেখানে ব্রাজিলের মতো দেশে এটি ২৬ শতাংশ। ওরা ট্যাক্স দেয়, সেবা পায়।” এই নিম্ন ট্যাক্স আদায়ের কারণে সরকারের রাজস্ব আয় অপ্রতুল, যা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর মতো খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে।
তিনি আরও বলেন, “ট্যাক্স কমানোর কথা বলা হয়। কমাতে কমাতে এমন অবস্থা হতে পারে যে আমরা বেতন-ভাতাও দিতে পারব না।”
এই বক্তব্যে তিনি জনগণের ট্যাক্স প্রদানে অনীহা এবং কর ফাঁকির প্রবণতার প্রতি ইঙ্গিত করেন। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি সেবা, যেমন শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি বা মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, “এই মাইনে দিয়ে শিক্ষকরা কী পড়াবেন?”
বেসরকারি খাতের উপর নির্ভরশীলতা ও বিনিয়োগের ঘাটতি
অর্থ উপদেষ্টা বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাইভেট সেক্টরের বিনিয়োগের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, “আমাদের প্রাইভেট সেক্টরের ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের চাহিদা অনেক বেশি।”
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। ব্যাংক খাতের ঋণের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং বিদেশি বিনিয়োগের সীমিত প্রবাহ অর্থনীতির বৃদ্ধিকে ধীর করে দিচ্ছে। এছাড়া, বড় বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোর জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হলেও তা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি অর্থনীতির টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সের উচ্ছ্বাস
বাস্তবতার বিপরীতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এবং বিভিন্ন সংবাদপত্রে রিজার্ভ বৃদ্ধি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির কথা প্রচার করা হলেও, ড. সালেহ উদ্দিনের বক্তব্যে এই ইতিবাচক দিকগুলোর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়। রেমিট্যান্স বৃদ্ধি অর্থনীতিতে স্বল্পমেয়াদি স্বস্তি এনে দিলেও, দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যা, যেমন নিম্ন রাজস্ব আয় এবং অর্থায়নের ঘাটতি, সমাধান করতে পারছে না।
তিনি বলেন, “আমরা যেখানে বসে থাকি, সরকারি লোকজন মনে করে সবকিছু দিয়ে দেওয়া যাবে। প্রতিদিন বলে এই দেন, সেই দেন। অর্থের যতটা সামর্থ্য, সেটা আমরা পাচ্ছি না।”
এই বক্তব্য সরকারের অতিরিক্ত প্রত্যাশা এবং বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান তুলে ধরে।
চ্যালেঞ্জ ও সমাধানের পথ
অর্থ উপদেষ্টার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের অর্থনীতি রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং ট্যাক্স ব্যবস্থার সংস্কার ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারবে না। ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর জন্য কর ফাঁকি রোধ, কর ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নতুন করদাতা সংযোজনের উদ্যোগ প্রয়োজন।
এছাড়া, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য নীতিগত সংস্কার জরুরি। সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হলে সরকারকে অর্থায়নের নতুন উৎস খুঁজতে হবে, যেমন পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার সঠিক ব্যবহার।
রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধির সুখবরের মাঝেও বাংলাদেশের অর্থনীতি গভীর সংকটের মুখে রয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদের বক্তব্যে এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে নিম্ন রাজস্ব আয়, অতিরিক্ত চাহিদা এবং অর্থায়নের ঘাটতি চিহ্নিত হয়েছে। সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই ঘাটতি পূরণ করে অর্থনীতিকে টেকসই পথে নিয়ে যাওয়া। কাঠামোগত সংস্কার এবং জনগণের সচেতন অংশগ্রহণ ছাড়া এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা কঠিন হবে।
