তড়িঘড়ি ও অব্যবস্থাপনায় ভরপুর ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড: উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতিতে আর্থিক বোঝা ও আইএমএফ এর আপত্তি

তড়িঘড়ি ও অব্যবস্থাপনায় ভরপুর ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড: উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতিতে আর্থিক বোঝা ও আইএমএফ এর আপত্তি
শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক

 

ঢাকা, ১৯ এপ্রিল ২০২৬: বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারের সুরক্ষায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য, ভর্তুকি, সহজ ঋণ ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’ চালু করা। ইশতেহার অনুসারে, ধাপে ধাপে দেশের প্রায় ৪ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হবে, যার মাধ্যমে প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা বা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করা হবে। অন্যদিকে, প্রায় ২.৭৫ কোটি কৃষককে কৃষক কার্ড দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে সার, বীজ, সেচ, ঋণ, বিমা ও বাজারজাতকরণে সুবিধা মিলবে।

 

ক্ষমতায় আসার মাত্র দেড় মাসের মাথায় এই দুটি উচ্চাভিলাষী কর্মসূচির বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুসারে, ১০ মার্চ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হয়েছে। প্রথম ধাপে ১৪ উপজেলায় প্রায় ৩৭,৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবারকে এই কার্ড দেওয়া হয়েছে। একইভাবে, ১৪ এপ্রিল (পহেলা বৈশাখ) টাঙ্গাইলসহ ১০ জেলার ১১ উপজেলায় কৃষক কার্ডের প্রি-পাইলটিং শুরু হয়েছে। এ পর্যায়ে প্রায় ২০-২২ হাজার কৃষককে (ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকসহ) কার্ড দেওয়া হচ্ছে, যার মধ্যে প্রায় ২০,৬৭১ জনকে বার্ষিক ২,৫০০ টাকা আর্থিক সহায়তাসহ ১০ ধরনের সুবিধা প্রদানের কথা রয়েছে।

 

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংখ্যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় নগণ্য। ৪ কোটি পরিবার ও ২.৭৫ কোটি কৃষককে কার্ড দেওয়ার জন্য বিশাল তথ্যভাণ্ডার তৈরি, ডিজিটাল সিস্টেম, বিতরণ ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়ন প্রয়োজন। কিন্তু শুরুতেই তথ্য সংগ্রহে ‘হযবরল’ অবস্থা ও তড়িঘড়ি করে পাইলট প্রকল্প চালু করায় এটি মার্কেটিং গিমিক বলে সমালোচনা উঠেছে।

 

অর্থনৈতিক চাপে কি সম্ভব বাস্তবায়ন?

সরকারের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ক্ষমতায় আসার মাত্র ৪৩ দিনে ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার, যা চলতি অর্থবছরের পুরো লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এই ঋণনির্ভরতা পরিচালন ব্যয় মেটাতেই ব্যয় হচ্ছে বলে জানা গেছে।

একই সঙ্গে জ্বালানি তেল সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি (ইআরএল) সাম্প্রতিক দিনগুলোতে  সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে ক্রুড ওয়েলের অভাবে। এর আগে গ্যাস সংকটে সার কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে, যা কৃষি উৎপাদনে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।

এমন পরিস্থিতিতে ফ্যামিলি কার্ডের আর্থিক সহায়তা (প্রতি পরিবারে মাসিক ২,৫০০ টাকা) ও কৃষক কার্ডের ভর্তুকি-সুবিধা বাস্তবায়নে অর্থায়ন কোথায় পাবে সরকার— তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। কৃষক কার্ডের সুবিধা যেমন সার ও বীজে ভর্তুকি, সেচ সুবিধা— সার কারখানা বন্ধ থাকায় তা কার্যকর করা কতটা সম্ভব, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

 

আইএমএফ বলছে আর্থিক বোঝা (Fiscal Burden):

ফ্যামিলি কার্ড পুরোপুরি চালু হলে (৪ কোটি পরিবারের লক্ষ্যে ২ কোটি পরিবার ধরে) বছরে প্রায় ৬০,০০০ কোটি টাকা খরচ হতে পারে। আগামী অর্থবছরে (২০২৬-২৭) শুধু ৪০ লাখ পরিবারের জন্যই সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ১৩,০০০ কোটি টাকা চেয়েছে। আইএমএফ মনে করে, বাংলাদেশের কম ট্যাক্স-টু-জিডিপি রেশিও, ঋণের সুদ পরিশোধ ও অন্যান্য অপরিহার্য খাতের (শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো) চাপের মধ্যে এত বড় নতুন ব্যয় টেকসই নয়। এতে ফিসক্যাল ডেফিসিট বাড়তে পারে।

আইএমএফ পরামর্শ দিয়েছে — পূর্ণাঙ্গ চালুর আগে feasibility study (সম্ভাব্যতা যাচাই) করতে এবং বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করে চালাতে। না হলে একই লোক একাধিক সুবিধা পাওয়া, অনিয়ম ও অদক্ষতা হতে পারে। আইএমএফ বাংলাদেশকে ট্যাক্স এক্সেম্পশন কমানো, সাবসিডি র্যাশনালাইজ করা ও রাজস্ব বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের বড় খরচ এই সংস্কারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে বলে তারা দেখছে।

 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, এগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। পাইলট প্রকল্প সফল হলে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হবে এবং এতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে না। টাকা মুদ্রা ছাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে না, বরং স্থানীয় অর্থনীতিতে ঘুরবে। তবে বিরোধীদল ও বিশ্লেষকরা মনে করেন, তড়িঘড়ি করে শুরু করা এই কর্মসূচি জনগণের প্রত্যাশা পূরণের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রচারণায় পরিণত হতে পারে যদি অব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠা না যায়।

 

 

 

Visited 13 times, 1 visit(s) today