কারাগার থেকে পালানো জঙ্গি বন্দিদের তথ্য প্রকাশের পরেই আইজি প্রিজন প্রত্যাহার

কারাগার থেকে পালানো জঙ্গি বন্দিদের তথ্য প্রকাশের পরেই আইজি প্রিজন প্রত্যাহার
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব প্রতিবেদক


কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া জঙ্গি ও ঝুঁকিপূর্ণ বন্দিদের সংখ্যা, জামিনে মুক্তি পাওয়া জঙ্গি এবং দেশের কারাগারগুলোর ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত বন্দির তথ্য প্রকাশের পর কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেনকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করেছে সরকার।

বুধবার তার প্রত্যাহারের খবর সামনে আসার পর সাম্প্রতিক সময়ে কারা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

তবে তাকে প্রত্যাহারের কারণ হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এমন কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি যে, তার প্রকাশ্য বক্তব্যের কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে বক্তব্যের সঙ্গে প্রত্যাহারের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

মোতাহের হোসেন এর আগে একাধিকবার কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের বিষয়ে গণমাধ্যমকে তথ্য দিয়েছেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অস্থিরতার সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে দুই হাজার ২০০-এর বেশি বন্দি পালিয়ে যায়। তাদের মধ্যে প্রায় এক হাজার ৫০০ জনকে পরে গ্রেপ্তার করা হলেও প্রায় ৭০০ বন্দি পলাতক ছিলেন। পলাতকদের মধ্যে জঙ্গি, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও শীর্ষ সন্ত্রাসীর মতো ঝুঁকিপূর্ণ বন্দিও ছিলেন।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে কারা মহাপরিদর্শক জানিয়েছিলেন, পলাতক বন্দিদের মধ্যে মোট ৭০ জন জঙ্গি ছিলেন। তাদের মধ্যে নয়জন দণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গি এবং বাকিদের বিরুদ্ধে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে মামলা বিচারাধীন ছিল বলে তিনি জানান।

একই সময়ে তিনি জানিয়েছিলেন, সরকার পতনের পর কারাগার থেকে আলোচিত ১৭৪ জন আসামি জামিনে মুক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে জঙ্গি সংগঠনের সদস্য হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিও ছিলেন। ১১ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীও জামিনে মুক্ত হওয়ার তথ্য দিয়েছিলেন তিনি।

পরবর্তী সময়েও পলাতক জঙ্গিদের বিষয়ে তথ্য প্রকাশ্যে আসে। ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে কারা অধিদপ্তরের তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়, কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে ৬৯ জনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৬০ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং নয়জন জঙ্গি ছিলেন।

এদিকে চলতি বছরের বিভিন্ন সময়েও কারাগারের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন মোতাহের হোসেন। জুলাইয়ে কারাগারে বন্দিদের চিকিৎসা, কারা ব্যবস্থাপনা এবং হেফাজতে মৃত্যুর বিষয়ে তার বক্তব্য গণমাধ্যমে আসে। তিনি কারাগারে চিকিৎসক ও অ্যাম্বুলেন্সের ঘাটতির কথাও স্বীকার করেছিলেন।

কারাগারের বন্দী ধারণক্ষমতা নিয়েও তার দেওয়া তথ্য আলোচনায় আসে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তিনি জানিয়েছিলেন, দেশের কারাগারগুলোর মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ৪২ হাজার হলেও ৫ আগস্টের আগে বন্দির সংখ্যা ছিল প্রায় ৮০ হাজার। পরে জামিনের কারণে সংখ্যা কমলেও আবার তা বাড়তে শুরু করে।

এই প্রেক্ষাপটে সাংবাদিক শোয়েব চৌধুরী তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এক স্ট্যাটাসে মোতাহের হোসেনের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি দাবি করেছেন, কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বা জামিনে মুক্ত হওয়া জঙ্গিদের বিষয়ে নথি না থাকার বিষয়টি গুরুতর এবং এসব তথ্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছেও গুরুত্ব পেতে পারে।

শোয়েব চৌধুরী তার স্ট্যাটাসে আরও প্রশ্ন তোলেন, এমন স্পর্শকাতর সময়ে কারা মহাপরিদর্শকের প্রকাশ্য বক্তব্যের পর তাকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো সম্পর্ক আছে কি না। একই সঙ্গে তিনি এমন সম্ভাবনাও উল্লেখ করেন যে, মোতাহের হোসেন একজন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে কারা ব্যবস্থাপনার বাস্তব পরিস্থিতি নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরেছেন।

তবে শোয়েব চৌধুরীর স্ট্যাটাসে করা এসব দাবি ও প্রশ্নের স্বাধীন কোনো যাচাই পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বা জামিনে মুক্ত হওয়া জঙ্গিদের নথি ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্ট বা গায়েব করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সরকারি কোনো প্রমাণও প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে কারা মহাপরিদর্শকের প্রকাশ্য বক্তব্যগুলোতে তিনি জঙ্গি বা ঝুঁকিপূর্ণ বন্দিদের বিষয়ে যে তথ্য দিয়েছেন, সেগুলো মূলত কারা অধিদপ্তরের হিসাব ও তার দায়িত্বের আওতায় পাওয়া তথ্য হিসেবেই উপস্থাপিত হয়েছে।

Visited 5 times, 5 visit(s) today