❐ চট্টগ্রাম ব্যুরো
চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলার (১টি কেন্দ্রীয় ও ১০টি জেলা) কারাগারে চরম ধারণক্ষমতা সংকটে এক ভয়াবহ মানবিক ও প্রশাসনিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বর্তমানে পুরো বিভাগের কারাগারগুলোতে মাত্র ৭,৭০০ জন বন্দি ধারণের ব্যবস্থা থাকলেও বাস্তবে অবস্থান করছেন ২০,৬১০ জন বন্দি।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক—যেখানে ১,৮৫০ জনের ধারণক্ষমতার বিপরীতে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে ৭,০৫১ জন বন্দিকে। অতিরিক্ত বন্দির এ উপচে পড়া ভিড়ে কারা কর্তৃপক্ষ তাদের দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে।
সংকটের বড় এক উৎস ব্রিটিশ আমলে স্থাপিত দুর্গম উপজেলাগুলোর ‘চৌকি আদালত’। এসব আদালতের বিচারপ্রার্থী ও বন্দিদেরও মূল চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়। মামলার ধার্য তারিখে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে সংশ্লিষ্ট দূরবর্তী আদালতে আসামিদের আনা-নেওয়ায় জটিলতা সৃষ্টি হয়।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট তারিক আহমেদ বিষয়টিকে বিচারিক ধীরগতির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তার মতে, বন্দিদের সময়মতো আদালতে হাজির করতে না পারায় ওই দিনের বিচারিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে, যা দিনশেষে বছরের পর বছর মামলার বিশাল জট তৈরি করছে।
ধারণক্ষমতার তিন থেকে চার গুণ বন্দি রাখায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা।
বাংলাদেশ মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান জানান, এমন ঘিঞ্জি পরিবেশে বন্দিদের মৌলিক অধিকার মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে, যা সরাসরি তাদের অধিকারের চরম লঙ্ঘন।
এ ছাড়া স্থান সংকটের কারণে ছোঁয়াচে রোগ ও সাধারণ স্বাস্থ্য পরিষেবা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর থেকে কারা হেফাজতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অস্বাভাবিক মৃত্যুর বিভিন্ন তথ্য এখানে
এই ভয়াবহ চাপ কমাতে ঢাকার কাশিমপুর ও কেরানীগঞ্জের মতো সাতটি দূরবর্তী ও মামলাপ্রবণ উপজেলায় ‘সাবজেল’ স্থাপনের প্রস্তাব করেছে কারা অধিদপ্তর।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রস্তাবে চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ, বাঁশখালী ও পটিয়া; কক্সবাজারের মহেশখালী ও চকরিয়া; বান্দরবানের লামা এবং নোয়াখালীর হাতিয়ায় এসব সাবজেল নির্মাণের সুপারিশ করা হয়।
চট্টগ্রাম বিভাগের কারা উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন্স) মোহাম্মদ ছগির মিয়া জানান, এসব চিহ্নিত দূরবর্তী স্থানে বন্দি আবাসন নিশ্চিত করা গেলে জেলা কারাগারগুলোর ওপর বিদ্যমান চাপ অনেকটাই নেমে আসবে।
প্রস্তাবনাটি গৃহীত হলে চাপ কমলেও অবকাঠামোগত বাস্তবায়ন নিয়ে দ্বিমত রয়েছে পুলিশ প্রশাসনের।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজিমুল হক দূরবর্তী এলাকা থেকে আসামি আনা-নেওয়ার চ্যালেঞ্জের কথা স্বীকার করে জানান, প্রতিটি উপজেলায় আলাদা সাবজেল পরিচালনা করার জন্য পর্যাপ্ত পুলিশি জনবল, অবকাঠামো ও আর্থিক সক্ষমতা আছে কিনা—তা নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে গভীরভাবে বিবেচনার বিষয়।
বিভাগের পুরোনো এই ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের ক্ষুদ্র অবকাঠামোগুলো পরিবর্তন করে আধুনিক ও পর্যাপ্ত ধারণক্ষমতার কারাগার ব্যবস্থার প্রশাসনিক সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
