❐ আয়নাল কারিগর
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের নির্বাচিত আঞ্চলিক পরিচালক সায়মা ওয়াজেদ পুতুল এক গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতায় বসা ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রাজনৈতিক চাপ এবং ডব্লিউএইচওর রহস্যজনক ও একপাক্ষিক সিদ্ধান্তের কারণে তিনি বর্তমানে দায়িত্ব পালনে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন।
এই প্রেক্ষাপটে, নিজেকে ‘ষড়যন্ত্রের শিকার’ দাবি করে সায়মা ওয়াজেদ তাকে অনির্দিষ্টকালের ছুটিতে পাঠানোর প্রক্রিয়ার বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন তদন্ত দাবি করেছেন।
ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর বুধবারের এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত আট মাসে সায়মা ওয়াজেদ একাধিকবার ডব্লিউএইচও এবং সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়াসুসের কাছে তাকে সরিয়ে দেওয়ার নেপথ্যের কারণ ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সর্বশেষ গত মাসে আইনজীবীর মাধ্যমে পাঠানো চিঠিতে তিনি ডব্লিউএইচওর সিদ্ধান্তের বিষয়ে স্বচ্ছতা দাবি করার পাশাপাশি প্রয়োজনে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন।
গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট বনাম প্রশাসনিক ষড়যন্ত্র
২০২৩ সালের নভেম্বরে ভারতের নয়াদিল্লিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক কমিটির ৭৬তম অধিবেশনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বিপুল ভোটে (১০টির মধ্যে ৮টি ভোট, যার মধ্যে ভারতের ভোটও ছিল) আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচিত হন সায়মা ওয়াজেদ। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি পাঁচ বছরের জন্য এই মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
পড়ুন: আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সায়মা ওয়াজেদকে মেন্টাল হেলথ অ্যাওয়ার্ড-২০২৫ প্রদান
তবে, ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। কেবল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে হওয়ার কারণেই তাকে রাজনৈতিকভাবে নিশানা করা হয় বলে অভিযোগ।
ঢাকায় তার অনুপস্থিতিতেই তার বিরুদ্ধে কথিত দুর্নীতির মামলা দায়ের করা হয়।
এর মাত্র চার মাস পর, ২০২৫ সালের ১১ই জুলাই, ডব্লিউএইচও সম্পূর্ণ নজিরবিহীনভাবে এবং নির্বাচিত সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মতামত উপেক্ষা করে সায়মা ওয়াজেদকে ‘অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটিতে’ পাঠায়। একজন নির্বাচিত পরিচালককে এভাবে তড়িঘড়ি করে প্রশাসনিক আদেশে সরিয়ে দেওয়াকে আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার ও সংস্থার নিজস্ব বিধির চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ডব্লিউএইচওর পক্ষপাতমূলক ও বিতর্কিত ভূমিকা
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সায়মা ওয়াজেদ অভিযোগ করেছেন যে, ‘যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই’ এবং কেবল ইউনূস সরকারের ‘অনুরোধে’ ডব্লিউএইচও তাকে ছুটিতে পাঠিয়েছে। এমনকি এই একপেশে সিদ্ধান্তের কোনো স্পষ্ট কারণও তাকে জানানো হয়নি। তিনি ডব্লিউএইচওর বিরুদ্ধে ‘পক্ষপাতিত্ব ও হয়রানির’ গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন।
সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ডব্লিউএইচও পুতুলের ইমেইলগুলো পেলেও তার তোলা মৌলিক প্রশ্নগুলোর কোনো সদুত্তর দেয়নি।
সংস্থার মহাপরিচালক কর্মীদের কাছে পাঠানো এক ইমেইলে স্বীকার করেছেন যে, ইউনূস সরকারের আপত্তি, পুতুলের নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন (যা সদস্য রাষ্ট্রগুলো দ্বারা স্বীকৃত ছিল) এবং দুদকের মামলার রাজনৈতিক বিষয়গুলো বিবেচনা করেই তাকে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হলো, সায়মা ওয়াজেদ অভিযোগ করেছেন যে, ডব্লিউএইচও সরাসরি দুদক ও তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ‘কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও প্রক্রিয়া লঙ্ঘন’ করেছে।
এছাড়া, নয়াদিল্লিতে তাকে ভোট দেওয়া সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে ‘বিকৃত তথ্য’ উপস্থাপন করে তার ‘সম্মানহানি’ করা হয়েছে বলেও তিনি মনে করেন।
দ্বৈত নীতি ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আলামত
একটি উচ্চপর্যায়ের সূত্র ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেছে, “একটি রাজনৈতিক অনুরোধ পাওয়ার পরপরই সায়মা ওয়াজেদকে ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্তটি ডব্লিউএইচওর স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থী। স্বয়ং তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়াসুস যখন নিজ দেশ ইথিওপিয়া থেকে একই ধরনের রাজনৈতিক আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন, তখন সংস্থার প্রতিক্রিয়া এমন ছিল না।”
এই দ্বৈত নীতি প্রমাণ করে যে, সায়মা ওয়াজেদের ক্ষেত্রে ডব্লিউএইচও রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছে।
সূত্রটি আরও জানায়, এক বছরের বেশি সময় ধরে তাকে ছুটিতে রাখা হলেও তার বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
পুতুলের ভাষ্য, তার যোগ্যতা ও স্বাস্থ্য খাতে অবদানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, কেবল পারিবারিক পরিচয়ের কারণে তাকে বাংলাদেশ সরকারের ‘ইশারায়’ নিশানা বানানো হয়েছে। ষড়যন্ত্রের মাত্রা এতটাই গভীর যে, প্রথমে তাকে সবেতনে ছুটিতে পাঠানো হলেও, প্রতিবাদ করায় পরে তা ‘বিনা বেতনে প্রশাসনিক ছুটিতে’ রূপান্তর করা হয়।
সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ম্যান্ডেট লঙ্ঘন
অন্য একটি সূত্রের মতে, “সায়মাকে যারা নির্বাচিত করেছিল, সেই সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়াই একটি তড়িঘড়ি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ওই ম্যান্ডেট পরিবর্তন করা হয়েছে। আঞ্চলিক পরিচালকরা মূলত তাদের নির্বাচিত করা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছেই দায়বদ্ধ।”
বর্তমানে আঞ্চলিক পরিচালকের পদটি শূন্য ঘোষণা না করলেও, নির্বাচিত পরিচালক সায়মা ওয়াজেদকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানোর জন্য ডব্লিউএইচওর ভেতর থেকে ‘ক্রমাগত চাপ’ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যা এই ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত রূপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় ডব্লিউএইচওর স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করার সক্ষমতা আজ চরম প্রশ্নবিদ্ধ। সায়মা ওয়াজেদ পুতুল কেবল একটি পদের জন্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক সংস্থায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হিসেবে ন্যায়বিচারের জন্য লড়ছেন।

