বিশেষ প্রতিবেদক
জামায়াতে ইসলামীর নেতা মুফতি আমির হামজা বছরের পর বছর ধরে ওয়াজের আড়ালে রাজনৈতিক উসকানি, সামাজিক বিভেদ ও চরমপন্থী মতবাদ ছড়িয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগে সমালোচিত।
বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে গ্রেপ্তার, সিঙ্গাপুরে নিষিদ্ধ এবং ভুয়া পাসপোর্ট ব্যবহারের ঘটনার পরও তিনি জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে রাজনৈতিক মাঠে ফিরেছেন। তার বক্তৃতা ও কার্যকলাপে ধর্মের অপব্যবহার করে কীভাবে তিনি মানুষকে ভুল পথে প্ররোচিত করছেন, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ধর্মীয় বক্তৃতার ছদ্মবেশে রাজনৈতিক প্রচারণা
আমির হামজা তার ওয়াজ মাহফিলে কোরান-হাদিসের তাফসিরের পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে লক্ষ্য করে বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি সরকারবিরোধী বক্তব্য দিয়ে জনগণকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করেন।
২০২১ সালে কুষ্টিয়ার পাটিকাবাড়ি ইউনিয়নের ডাবিরাভিটা গ্রামে গ্রেপ্তারের সময় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট জানায়, তার বক্তৃতা জঙ্গিবাদী সংগঠন আনসার আল-ইসলামের সদস্যদের উৎসাহিত করেছে।
শাকিব নামে এক তরুণ উগ্রবাদী জাতীয় সংসদে তলোয়ার হামলার পরিকল্পনা করেছিল, যার পেছনে আমির হামজার বক্তৃতার প্রভাব ছিল বলে আদালতে স্বীকার করা হয়। এসব বক্তব্যে ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে তিনি তরুণদের চরমপন্থার দিকে ঠেলে দিয়েছেন।
সিঙ্গাপুরে চরমপন্থী বক্তৃতা ও বিভাজনবাদ
২০২৪ সালের ৯ই আগস্ট সিঙ্গাপুরের টুয়াসে ল্যান্টানা লজ ডরমিটরিতে বাংলাদেশী প্রবাসী শ্রমিকদের মাঝে আমির হামজা একটি অবৈধ সমাবেশে বক্তৃতা দেন। তিনি ভুয়া পাসপোর্টে “সাইফুল ইসলাম” নামে সে দেশে প্রবেশ করেন, যা তার পরিচয় গোপনের কৌশল ছিল।
বক্তৃতায় তিনি অমুসলিমদের “কাফির” বলে সম্বোধন করেন, শেখ হাসিনা সরকারকে “জালেম” আখ্যা দেন এবং বাংলাদেশকে “ইসলামী রাষ্ট্র” করার আহ্বান জানান।
এছাড়া, নিষিদ্ধ জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের ধর্মীয় আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করেন। সিঙ্গাপুরের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই বক্তৃতাকে “উগ্র মতাদর্শ এবং সাম্প্রদায়িক উস্কানি” হিসেবে চিহ্নিত করে, যা দেশটির সামাজিক সম্প্রীতির জন্য হুমকি।
সিঙ্গাপুরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ (ISD) তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে, এবং তাকে দেশটিতে নিষিদ্ধ করা হয়। এই ঘটনা দেখায়, আমির হামজা ধর্মীয় বক্তৃতার আড়ালে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও চরমপন্থী মতবাদ ছড়াচ্ছেন।
নারীবিদ্বেষী ও অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য
আমির হামজা তার বক্তৃতায় প্রায়ই অপ্রাসঙ্গিক ও নারীবিদ্বেষী মন্তব্য করে সমালোচনার মুখে পড়েছেন। সম্প্রতি ভারতীয় অভিনেত্রী রাশমিকা মান্দানাকে “বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দরী মুখ” বলে উল্লেখ করে তিনি ধর্মীয় মাহফিলের মর্যাদা নষ্ট করেন। এই মন্তব্য ধর্মীয় আলোচনার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ এবং নারীদের প্রতি অবমাননাকর বলে বিবেচিত হয়।
এছাড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে আজান-নামাজ ব্যাহত হওয়া এবং ছাত্রদের মদ্যপানের অভিযোগ তুলে তিনি ছাত্র সমাজের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন তার দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানায়, তিনি কখনোই সেখানকার ছাত্র ছিলেন না। এসব মিথ্যা ও উসকানিমূলক বক্তব্য ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে তরুণদের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়ানোর কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পর আমির হামজা ক্রমাগতভাবে মাস্ক না পরতে উৎসাহ দিয়ে আসছিলেন। বলেন, ‘করোনা এসেছে ইসলামে অবিশ্বাসীদের শায়েস্তা করতে’। তিনি এমনও বলেন, ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়লে কারও করোনা হবে না। কোনো মুসলমানের করোনা হলে কোরান মিথ্যা হয়ে যাবে।’
রাজনৈতিক ছদ্মবেশ ও জামায়াতে ইসলামীর প্ল্যাটফর্ম
আমির হামজার রাজনৈতিক যাত্রা তার ধর্মীয় প্রচারের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তিনি জামায়াতে ইসলামীর কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ প্রার্থী হিসেবে প্রকাশ্যে এসেছেন। জামায়াতের পুনর্বহালের পর (২০২৫ সালের জুন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে) তিনি দলটির প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য একত্র করছেন।
তার বক্তৃতায় জামায়াতের নিষিদ্ধ নেতাদের উল্লেখ এবং “ইসলামী রাষ্ট্র” গঠনের আহ্বান তার রাজনৈতিক এজেন্ডার প্রমাণ। সমালোচকরা বলছেন, তিনি ধর্মের আবরণে জামায়াতের রাজনৈতিক মতবাদ প্রচার করছেন, যা জনগণকে বিভ্রান্ত করছে।
‘আমি কসম দিচ্ছি আপনার কাছে করোনা আসবে না। যদি আসে আমার কাছ থেকে বুঝে নিয়েন যান। যদি আসে তাহলে কোরান শরিফ মিথ্যা হয়ে যাবে। আল্লাহ কি তার কোরআনকে মিথ্যা প্রমাণ করবেন’?
ব্যাপক সমালোচনার মুখে আমির হামজা সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি এখন থেকে কোরান-হাদিসের তাফসিরের বাইরে কিছু বলবেন না।
তিনি বলেন, “সংগঠনের দায়িত্বশীলরা বিতর্কিত ও রাজনৈতিক বক্তব্য থেকে বিরত থাকতে বলেছেন।”
তিনি তার পূর্বের বক্তব্যে কারও কষ্ট হলে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তবে, সমালোচকরা মনে করেন, এটি জনরোষ থেকে বাঁচতে এবং জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর কৌশল। তার পূর্বের কার্যকলাপ বিবেচনায় এই ঘোষণা কতটা আন্তরিক, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
আমির হামজার বক্তৃতা ও কার্যকলাপ তরুণদের মধ্যে ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে চরমপন্থা ও বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। তার বক্তব্যে নারীবিদ্বেষ, সামাজিক বিভেদ এবং রাজনৈতিক উসকানির মিশ্রণ তরুণদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। সিঙ্গাপুরের ঘটনা এবং বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ তার কার্যকলাপের আন্তর্জাতিক মাত্রা তুলে ধরেছে।
জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে তার নতুন ভূমিকা ধর্মের আড়ালে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রকাশ বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ধর্মীয় বক্তা হিসেবে আমির হামজার যাত্রা ধর্মের অপব্যবহার, ভুয়া পরিচয় এবং রাজনৈতিক উসকানির মিশ্রণ। তার বক্তৃতা ও কার্যকলাপে মানুষকে ভুল পথে প্ররোচিত করার প্রমাণ স্পষ্ট। সিঙ্গাপুরে নিষিদ্ধ হওয়া, বাংলাদেশে গ্রেপ্তার এবং এখন জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে তার উত্থান দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। জনগণ ও কর্তৃপক্ষের সতর্কতাই পারে এই ধরনের বিভ্রান্তিকর প্রভাব রোধ করতে।

