বিশেষ প্রতিবেদক
ঢাকার রাজপথে প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে একই চিত্র—আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা মিছিল করছে, শ্লোগান দিচ্ছে, বুক চিতিয়ে রাজপথ কাঁপিয়ে দিচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে একের পর এক উঠছে মিছিল—কখনো আগারগাঁও, কখনো ধানমন্ডি, কখনো গুলিস্তান কিংবা মতিঝিলে। শ্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠছে রাজপথ: “শেখ হাসিনা ফিরবে, বাংলাদেশ হাসবে”।
এসব মিছিলে অংশ নিতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে তৃণমূলের কর্মীরা ঢাকায় ছুটে আসছেন। কেউ আসছেন ভোরের ট্রেনে, কেউ বাসে, কেউবা পকেটে ভাড়া না থাকলেও হেঁটে কিংবা লিফট নিয়ে। খেয়ে না খেয়ে, না ঘুমিয়ে, পুলিশের বাধা পেরিয়ে তারা অংশ নিচ্ছেন রাজপথের লড়াইয়ে। অনেকেই গ্রেপ্তার আতঙ্কে ভুগছেন, তবুও পিছু হটছেন না।
তাদের কাছে এই লড়াই কেবল রাজনৈতিক নয়—এটি দলের প্রতি বিশ্বাস, নেত্রীর প্রতি আনুগত্য এবং সংগঠনের প্রতি দায়িত্ববোধের প্রকাশ।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ এবং আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীরা নিজেদের উদ্যোগে আলাদা আলাদাভাবে মিছিল করছেন। কারও মিছিল হচ্ছে নির্দিষ্ট এলাকা ঘিরে, আবার কেউ করছেন নিজেদের রাজনৈতিক সার্কেল বা পরিচিত কর্মীদের নিয়ে।
একইসঙ্গে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় নেতার অনুসারীরাও তাদের নিজ নিজ নেতাদের নামে ব্যানার নিয়ে মিছিল করছেন। কোনো কোনো মিছিলে জাহাঙ্গীর কবির নানক, বাহাউদ্দিন নাছিম, যুবলীগ নেতা মাইনুল হোসেন খান নিখিলসহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতাদের নামেও শ্লোগান দেওয়া হচ্ছে। তবে এসব নেতাদের কারও পক্ষ থেকেই কোনো সম্মিলিত নির্দেশনা, রোডম্যাপ বা মাঠপর্যায়ের কর্মীদের পাশে থাকার বার্তা আসছে না।
ফলে বিচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকা এসব মিছিল কার্যকর কোনো রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারছে না। বরং এতে অংশ নেওয়া বহু কর্মী গ্রেপ্তার ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন, অথচ তাদের খোঁজখবর নিচ্ছে না কেউ।
ঢাকায় বিভিন্ন মিছিলের সমন্বয় করা সাবেক এক ছাত্রনেতা বিডি ডাইজেস্টকে বলেন, “আমরা ঢাকায় প্রতিনিয়তই মিছিলের আয়োজন করছি। কিন্তু কেন্দ্রের সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই। যোগাযোগ করারও তো কোনো উপায় নেই। আমরা নিজেরাই সংঘবদ্ধ হয়ে মিছিল করছি।
অন্যদিকে কলকাতায় থাকা আরেক ছাত্রনেতা বলেন, “দেশে যে যাবো, কিসের ভিত্তিতে যাবো? আমাদের তো কোনো নির্দেশনাই দেওয়া হয়নি।”
রাজপথে নেমে অনেক কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন, অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, কেউ কেউ আঘাতও পেয়েছেন। স্থানীয় পর্যায়ে অনেকে চাকরি হারানোর ভয়, পারিবারিক চাপ কিংবা আর্থিক অনটনের মাঝেও সংগঠনের পতাকা হাতে তুলে নিচ্ছেন।
বরিশালের এক ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, “আমরা জানি না কালকে ধরা পড়বো কিনা, বাসায় ফিরতে পারবো কিনা, কিন্তু আমরা এসেছি শেখ হাসিনার পক্ষে দাঁড়াতে। দল আমাদের বিপদে পাশে থাকুক বা না থাকুক—আমরা থাকবো।”
ঢাকার ওয়ার্ড পর্যায়ের এক যুবলীগ নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা খেয়ে না খেয়ে লড়ছি, পুলিশের লাঠির বাড়ি খাচ্ছি, মামলা খাচ্ছি। অথচ কেন্দ্র থেকে নির্দিষ্টভাবে কিছু বলা হচ্ছে না, এটা খুব কষ্টের।”
রাজশাহী থেকে আসা ছাত্রলীগ কর্মী রাব্বানী জানান, “বাবা বলেছে, চাকরির বয়স শেষ হয়ে যাবে মামলা খেলে। কিন্তু আমি বলেছি, দেশ বাঁচলে তবেই তো চাকরি থাকবে। আমি তাই এসেছি।”
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থেকে আসা যুবলীগ কর্মী জাফর বলেন, “দুইদিন ধরে পকেটে একটাকাও ছিল না। সাথের বন্ধুর কাছ থেকে ধার করে ঢাকায় এসেছি। আমরা খাই না খাই, শেখ হাসিনার জন্য রাজপথ ছাড়বো না।”
অনেকেই পুলিশের বাধা সামলে গোপনে অবস্থান নিয়ে মিছিলের সময় হঠাৎ জড়ো হন এবং পরে দ্রুত ছত্রভঙ্গ হয়ে যান—যাতে গ্রেপ্তার এড়ানো যায়। এই কৌশলও গড়ে তুলেছেন তারা নিজেরাই, কোনো কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ছাড়াই।
এছাড়াও গ্রেপ্তার আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতেও দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তেমন কোনো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর একাধিক মিছিল থেকে বেশ কিছু নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু তাদের আইনি সহায়তা পাওয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা ধরনের জটিলতা ও ভোগান্তি।
এই পরিস্থিতিতে দলের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে থেকে কিছু সাহসী আইনজীবী নিজ উদ্যোগে গ্রেপ্তার নেতাকর্মীদের জামিন ও মামলার আইনি লড়াইয়ে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন। তবে তারা জানাচ্ছেন, এতে তারা নানা ধরনের চাপের মুখে পড়ছেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ও পেশাগতভাবে বাধা সৃষ্টি, হুমকি এবং এমবিও (মিসবিহেভিয়ার) তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবুও এসব আইনজীবীরা দলের প্রতি দায়বদ্ধতা ও মানবিক বিবেচনায় গ্রেপ্তার নেতাকর্মীদের পাশে থাকার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাদের পাশে দাঁড়ানোর বা কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সাপোর্ট দেওয়ার কোনো উদ্যোগই নেয়নি। আইনজীবীদের বরাতেই এসব তথ্য জানা গেছে।
ফলে মাঠে লড়াই করা এবং রাজপথে আন্দোলনরত নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের অসন্তোষ ও হতাশা তৈরি হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যখন রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান নিয়েই ব্যস্ত, তখন গ্রেপ্তার নেতাকর্মীদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার মতো একটি মৌলিক ও জরুরি বিষয়েও তাদের উদাসীনতা তৃণমূলের সাহস ও মনোবলকে ভেঙে দিচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডি ডাইজেস্টকে জানান, তাদের ২৫ জন আইনজীবির একটি দল জেলা আদালতে এবং ১২ জনের একটি দল হাইকোর্টে নেতাকর্মীদের আইনি সহায়তা প্রদান করছেন। সব কার্যক্রম তারা নিজেদের ব্যক্তিগত চাঁদা থেকে চালাচ্ছেন।
এক প্রশ্নের জবাবে আরো জানান, এ পর্যন্ত দলের কোনো কেন্দ্রীয় নেতা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।
এদিকে কানাডাভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন গ্লোবাল জাস্টিস নেটওয়ার্ক গত বছরের ৫ই আগস্টের পর থেকেই নির্যাতিত আওয়ামী লীগ কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছে।
সংগঠনের একজন পরিচালক কাজী মামুন সম্প্রতি এক ফেসবুক পোস্টে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, এটা আমাদের চরম ব্যর্থতা আমাদের যে এই ছেলেমেয়েদের জন্য একটা আর্থিক সাহায্যর ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত করা গেল না। ১৫ মাস ওরা ঘরের বাইরে, দল থেকে একটা ফান্ড পর্যন্ত করা হলো না। অথচ এসব বিষয়ে দায়িত্ব পালন করার মতো দলের সম্পাদক সহ-সম্পাদক এমন কত কত লোক আছেন না?
তিনি আরও বলেন: এই যে হাজার হাজার নেতাকর্মী কারাগারে, এখন পর্যন্ত একটা আইনি সহয়তা কাঠামো তৈরি করা হয়নি। যা সাহায্য হচ্ছে সবই ব্যক্তিগত উদ্যোগে। নেত্রী কি বারবার বলছেন না কাজ করতে? মাঠে নামতে? আইনি দায়িত্ব পালনের মতো ৬টা সংগঠনের পদ-পদবিধারীরা কে কোথায়?
তার এই মন্তব্য দলীয় কাঠামোর মধ্যে এখনো সমন্বিত আর্থিক ও আইনি সহায়তা গড়ে না ওঠার বিষয়টি স্পষ্ট করে, যদিও নেতৃত্ব বারবার সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব কাঠামো এই মুহূর্তে ভীষণ শিথিল অবস্থায় আছে। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও তৃণমূলের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ছে।
তাদের মতে, দলের শীর্ষ পর্যায় যদি এই পরিস্থিতি দ্রুত মোকাবিলা না করে এবং তৃণমূলের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা না দেয়, তাহলে তৃণমূলের মনোবল ভেঙে পড়তে পারে, যা পুরো সংগঠনের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে।
