জামিল হাসান
গণমাধ্যমে সংবাদ এসেছে চীন নাকি বাংলাদেশকে বিনামূল্যে ২০টি রেল ইঞ্জিন দিচ্ছে। এতে বাংলাদেশ রেলওয়ের মিটারগেজ ইঞ্জিন সংকটের কিছুটা সুরাহা হবে। পত্রিকার শিরোনাম আর ভেতরের সংবাদের সাথে কোনো মিল পাওয়া গেল না।
প্রকাশিত সংবাদে বলা হচ্ছে: বাংলাদেশ রেলওয়ের (বিআর) জন্য ২০টি মিটারগেজ (এমজি) লোকোমোটিভ কেনায় সহায়তা হিসেবে ১২৯ কোটি ৫৪ লাখ ডলার (প্রায় ১ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা) অনুদান দিচ্ছে চীন।” অর্থাৎ চীন ইঞ্জিন দিচ্ছে না, ইঞ্জিন কেনার জন্য আর্থিক সহয়তা দিচ্ছে। রেল মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে ‘চায়না গ্রান্টের আওতায় বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ২০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহ’ শীর্ষক প্রস্তাব অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে।
পিডিপিপি অনুযায়ী, ২০টি ইঞ্জিন সংগ্রহের প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা (প্রায় ১৩৩ কোটি ১২ লাখ ডলার)। এর মধ্যে ১ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা দেবে চীন এবং বাকি ৪৪ কোটি টাকা (প্রায় ৩ কোটি ৫৮ লাখ ডলার) আসবে সরকারি তহবিল থেকে। বিনামূল্যের ইঞ্জিনের জন্য আবার নাকি সরকারকে ৪৪ কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে!
২০২০ সালে ১০টি) এবং ২০২৩ সালে ২০টিসহ ভারত উপহার হিসেবে মোট ৩০টি ইঞ্জিন দিয়েছে বাংলাদেশকে। যা এখন পশ্চিমাঞ্চলের রেলে দাপিয়ে সার্ভিস দিয়ে চলছে। উপহার হিসেবে পাওয়া এসব ইঞ্জিন গড়ে ৮ বছরের পুরাতন। একটা ডিজেল ইঞ্জিনের সাধারণ মেয়াদকাল ২০ বছর। বাংলাদেশে সার্ভিসিং করিয়ে ৩০/৩৫ বছরও চলে এসব ইঞ্জিন। চীন যদি বাংলাদেশকে বিনামুল্যে দিতে চায়, তবে তাদের ব্যবহৃত পুরাতন ইঞ্জিন দিলেও হয়। কারণ আমাদের এখন জরুরি ভিত্তিতে মিটারগেজ ইঞ্জিনের প্রয়োজন।
চীন যদি ভারতের মত তাদের ৮/১০ বছরের পুরাতন (ভালো কন্ডিশনের) ইঞ্জিন উপহার হিসেবে বাংলাদেশকে দেয়, তবে তো ধান্দার কোন সুযোগ থাকছে না সেখানে।
এখন আসল ঘাপলার বিষয়ে আসি। এডিবির অর্থায়নে দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পে শেখ হাসিনা সরকার ৬ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা সাশ্রয় করেছিল। সেই অর্থ সংযুক্ত করে নতুন একটা প্রকল্প এখন চলছে- দোহাজারী-চট্টগ্রাম ডুয়েলগেজ রেললাইন স্থাপন ও নতুন ইঞ্জিন সংগ্রহ।
শেখ হাসিনার সরকারের সময় এই প্রকল্পের আওতায় ১৫০০ কোটি টাকায় দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম কোম্পানি থেকে ৩০টি নতুন মিটারগেজ রেল ইঞ্জিন কেনার জন্য রেলওয়ে অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছিল। গত বছরের ৫ই আগস্ট সরকার পরিবর্তন হলে সেই প্রকল্প ইউনূস সরকার বাতিল করে। নতুন করে ২০টি ইঞ্জিনের জন্য চীনের ফান্ডিং চায় ইউনূস সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারকে চীন এই অর্থ অনুদান হিসেব দিবে বলেছে।
এই ইঞ্জিন সংগ্রহের জন্য রেলওয়ে এখন টেন্ডার আহবান করতে যাচ্ছে। যেহেতু চীন অনুদান হিসেবে দিচ্ছে, সেহেতু চীন থেকেই এই ইঞ্জিন কিনতে হবে। হ্যাঁ, কিনতেই হবে।
আসল খেলাটা এখানেই। ১৫০০ কোটি টাকায় ৩০টি হুন্দাই রোটেমের স্থলে এখন ১৬৩৫ কোটি টাকায় চীনা ইঞ্জিন কেনা হবে। কোরিয়া থেকে ইঞ্জিন কিনলে প্রতিটির মূল্য পড়ত ৩০ কোটি টাকা প্লাস। এর আগেও ২৮-৩০ কোটি টাকায় শেখ হাসিনা সরকার ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ কিনেছিল। কিন্তু নতুন হিসেবে প্রতিটি চীনা ইঞ্জিন কিনতে প্রায় ৮০ কোটি টাকা খরচ করতে হবে! কোথায় ৩০ কোটি আর কোথায় ৮০ কোটি!
আসল খেলাটা এখন বুঝলেন তো? ইঞ্জিনপ্রতি কত কোটি টাকা চুরির ব্যবস্থা করা হয়েছে। কারা কারা এই টাকার ভাগ পাবেন চিন্তা করেন।
শেখ হাসিনা সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ব্রডগেজের ৩৩০০ হর্সপাওয়ারের ৪০টি শক্তিশালী ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ কিনেছিল প্রতিটি ২৮ কোটি টাকায়। হুন্দাই রোটেম থেকে ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ কিনেছিল প্রতিটি ৩৮ কোটি টাকায়। চীনের অর্থে কেনা ইঞ্জিন দেশে ডেলিভারি আসতে কমপক্ষে ৩৬-৪২ মাস সময় লাগবে। সে কারণে এখনই টেন্ডার করে ফেলার জন্য ইউনূস সরকার এত উতলা হয়ে উঠেছে, তা সবাই বিলক্ষণ বুঝতে পারছেন আশা করি।
নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকার যেন এই সুখস্বপ্নে পানি ঢেলে দিতে না পারে, সেজন্যই তড়িঘড়ি সব বন্দোবস্ত করতে হচ্ছে। এটাই নয়া দেশের নয়া বন্দোবস্ত।
লেখক পরিচিতি: রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক






