প্রবাসীদের পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সহজীকরণ: ইউনূস সরকারের আরেকটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত

প্রবাসীদের পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সহজীকরণ: ইউনূস সরকারের আরেকটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত
শেয়ার করুন

❐ বিশেষ প্রতিবেদক

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সংক্রান্ত বিধিমালা সহজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা দেশের আইনি ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। নতুন নিয়মে বাংলাদেশি পাসপোর্ট ছাড়াও বিদেশি পাসপোর্টে ‘নো ভিসা রিকোয়ার্ড’ স্টিকার, জন্মসনদ বা জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলেই প্রবাসীরা বিদেশ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পাদন করতে পারবেন।

এই সিদ্ধান্ত প্রবাসীদের সম্পত্তি ও আইনি বিষয় নিষ্পত্তিতে সুবিধা আনলেও, এটি অপরাধী ও পলাতক ব্যক্তিদের সম্পদ হস্তান্তর এবং অর্থ পাচারের পথ সহজ করছে বলে সমালোচকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।

নতুন নিয়মের সুবিধা ও উদ্দেশ্য

অন্তর্বর্তী সরকারের দাবি, এই সংশোধনী প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা ও পারিবারিক বিষয় নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ভোগান্তি কমাবে। পূর্বের নিয়মে বাংলাদেশি পাসপোর্ট বাধ্যতামূলক ছিল, যা অনেক প্রবাসীর জন্য জটিলতা সৃষ্টি করত। নতুন বিধানে বিদেশি পাসপোর্টে ‘নো ভিসা রিকোয়ার্ড’ স্টিকার বা জন্মসনদের মাধ্যমে পরিচয় যাচাই করে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পাদনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এটি প্রবাসীদের সময় ও খরচ সাশ্রয় করবে এবং তাদের দেশের সঙ্গে আর্থিক ও পারিবারিক সম্পর্ক বজায় রাখতে সহায়তা করবে বলে সরকার মনে করে।

ঝুঁকি ও সমালোচনা

কিন্তু এই সিদ্ধান্ত দেশের আইনি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন। পূর্বের নিয়মে সম্পত্তি হস্তান্তর বা বিক্রির ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজিরা দিয়ে দলিলের মূল্য বুঝে পাওয়ার বিষয়ে সম্মতি দিতে হতো। এটি ভুয়া ব্যক্তির মাধ্যমে সম্পদ বিক্রি বা হস্তান্তর রোধে সুরক্ষা হিসেবে কাজ করত। নতুন নিয়মে এই প্রক্রিয়া শিথিল করায় পলাতক অপরাধী, ফৌজদারি মামলার আসামি বা অর্থ পাচারকারীরা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সহজেই সম্পদ বিক্রি করে হুন্ডি বা অন্যান্য মাধ্যমে অর্থ বিদেশে পাচার করতে পারবে।

বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) একজন সাবেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এই নিয়ম অর্থ পাচারের জন্য নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। বিশেষ করে, ড. ইউনূসের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ হস্তান্তর এই নিয়মে সহজ হয়েছে, যা নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “পলাতক আসামিরা এখন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সম্পদ বিক্রি করে অর্থ বিদেশে নিয়ে যেতে পারবে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য হুমকি।”

দেশীয় বিশেষজ্ঞদের উপেক্ষা ও জনমনে প্রশ্ন

ইউনূস সরকারের প্রবাসীদের প্রাধান্য দেওয়ার নীতি ইতোমধ্যে ব্যাপক সমালোচনার মুখে রয়েছে। মহেশখালী ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (মিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যানের প্রবাসী আরবান প্ল্যানার নিয়োগের ঘোষণার পর স্থপতি সমাজে যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল, এই সিদ্ধান্ত তাকে আরও তীব্র করেছে।

আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, “এই সিদ্ধান্ত শুধু প্রবাসীদের সুবিধা দেওয়ার জন্য নয়, বরং নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর সম্পদ পাচারে সহায়তা করতে পারে। দেশীয় আইনজীবী, অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের উপেক্ষা করে এমন নীতি গ্রহণ জনমনে অসন্তোষ বাড়াবে।”

নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি

বাংলাদেশের অর্থনীতি ইতোমধ্যে জুলাই আন্দোলনের পরবর্তী অস্থিরতা ও বেকারত্বের সংকটে জর্জরিত। এই পরিস্থিতিতে সম্পদ পাচারের সুযোগ সৃষ্টি অর্থনীতির জন্য আরেকটি ধাক্কা হতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, পাওয়ার অব অ্যাটর্নির নিয়ম শিথিল করার আগে কঠোর পরিচয় যাচাই, সম্পদের উৎস নিরীক্ষণ এবং পাচাররোধী ব্যবস্থা জোরদার করা উচিত ছিল।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একজন কর্মকর্তা বলেন, “এই নিয়মে সম্পদ বিক্রির প্রক্রিয়া সহজ হলেও, এটি অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। ফৌজদারি মামলার পলাতক আসামিরা এখন সহজেই তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সম্পদ বিক্রি করতে পারবে, যা আইনের শাসনের জন্য হুমকি।”

ইউনূস সরকারের পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সংক্রান্ত নতুন বিধান প্রবাসীদের জন্য সুবিধা আনলেও, এটি দেশের আইনি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। সমালোচকরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ব্যক্তিদের সুবিধা দেওয়ার জন্য নেওয়া হয়েছে, যা দেশীয় বিশেষজ্ঞ ও নাগরিকদের প্রতি সরকারের অবিশ্বাসের প্রতিফলন। এই পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ নীতি গ্রহণের দাবি জোরালো হচ্ছে, যাতে প্রবাসীদের সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা যায়।

Visited 8 times, 1 visit(s) today